সোহেল খান দূর্জয় নেত্রকোনায় : বাংলাদেশ একটি সমতল ভূমির দেশ হলেও শুধুমাত্র উত্তর পূর্বে নেত্রকোনার পাহাড়, উত্তর পশ্চিমে নেত্রকোনার নিচু পাহাড় এবং উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমে কিছু উচ্চভূমি আছে। এসবের মধ্যে অন্যতম পাহাড় সমূহ হচ্ছে পাঁচ গাঁও, বিজয়পুর।এই জেলায় বসবাসকারী পাহাড়ি অধিবাসীরা বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীতে বিভক্ত হলেও এদের জীবন যাত্রা প্রায় একই রকম। এক সময় এইসব পাহাড়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল আদিম সভ্যতা। গায়ে ছিল না আজকালের আধুনিকতার ছোঁয়া। জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসেব অনুসারে, বাংলাদেশে ক্ষুদ্র নৃ জাতিগোষ্ঠীর সংখ্যা ৪৫টি এবং এদের বেশিরভাগই পাহাড়ে বসবাস করে। তাদের রয়েছে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভাস ও উৎসব। প্রত্যেক গোষ্ঠীর খাদ্য, পোশাক ও জীবন যাপন প্রণালীতেও রয়েছে ভিন্নতা। এই ধারাগুলো আজও রয়ে গেছে আমাদের নেত্রকোনার পাহাড়ে বসবাসকারী ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর মানুষদের মধ্যে। আমাদের নেত্রকোনার পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে চাকমা, গারো, ম্রং, রাখাইন, মনিপুরি এসব ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস। তাদের অতি সাধারণ জীবনযাপন, কাঠের ঘর, মসলা বিহীন খাবার, পোশাক,সমতলের মানুষদের মনে তৈরি করে কৌতূহল।তাদের রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতি ও উৎসব। প্রতিবছর বাঙালি বর্ষ বরণের সাথে তারাও তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির বৈসাবি উৎসব পালনের মাধ্যমে বছর শুরু করে।
স্বভাবতই আদিবাসীরা বেশ পরিশ্রমী। অধিকাংশ আদিবাসী সমাজে নারীরা খাদ্য সংগ্রাহক ও বিক্রেতা। তাদেরকে খাদ্য সংগ্রহের জন্য বনে-জঙ্গলে কিংবা ছড়ায় ছড়ায় ঘুরতে হয়। একইভাবে সংগৃহীত নানা ফলমূল বিক্রির লক্ষ্যে বাজারেও ছুটতে হয়। প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া শাক-সবজিসহ উৎপাদিত ফলফলাদির দাম কমে যাওয়ায় অধিক পরিশ্রমের পাশাপাশি নানা ঝুঁকিও বেড়েছে। এছাড়াও পুরুষেরা তো দিন রাত কাজ করেই যাচ্ছে।তবুও যেনো পাহাড়ে খাদ্য সংকট পুরোপুরী মিটছে না। পাহাড়ে এখন শুধু খাদ্য সংকট নয়, পানীয় জলের সংকটও একটি স্থায়ী সমস্যার রূপ নিয়েছে। পাহাড়ে অনেক পাড়া আছে পানি সংগ্রহের জন্য পাহাড়ের পর পাহাড় পাড়ি দিতে হয়।
যাদের জীবন ছিল জন্মের পর থেকেই পাহাড়ের চূড়া থেকে পানি এনে জীবন যাপন করা। আদিবাসীদের জীবন মানেই নিত্যদিনের সংগ্রাম করে জীবন যাপন করা। মহামারী তাদের জীবন সংগ্রামকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিলো। এছাড়াও বর্তমানে পাহাড়ের তরুণদের বিরাট একটি অংশ এখন তৈরি পোশাক খাতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু শ্রমিকদের উল্লেখযোগ্য চাকরি হারিয়ে এখন গ্রামে অলস সময় পার করছেন।পাহাড়ী আদিবাসীদের কাজের কোনো স্থায়িত্ব নেই,যখন ইচ্ছে ছাটাই করা হয় মালিক পক্ষ থেকে। খেয়াল করলে দেখা যাবে যে, বর্তমানে পাহাড়ে এখন তেমন বনজঙ্গলও আর অবশিষ্ট নেই। একদিকে বন বিভাগ অন্যদিকে নানা কোম্পানির দখল আতঙ্ক জুমচাষিদের কাছে নিত্যসঙ্গী। মৌজাবন প্রথা ও ভূমি অধিকার নিশ্চিত করা গেলে পাহাড় ও সমতলের বননির্ভর মানুষদের খাদ্য সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়বে। পাশাপাশি দেশেও বন ও বনজ সম্পদ বৃদ্ধিতে তা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে বিশ্বাস করি। বন রক্ষা করা গেলে নেত্রকোনা অঞ্চল পর্যটকবান্ধব শুধু নয়, অফুরন্ত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার হিসেবেও অক্ষুণ্ণ থাকবে।
এছাড়াও কিছু কিছু জায়গায় দেখা গেছে, আদিবাসীদের জীবন যাচ্ছে শুধু প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে। এদের নেই কোনো সুনিশ্চিত বসতভিটা, আবাসস্থল। প্রতিবছর তাঁরা এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে স্থানান্তরিত হয়ে জুমচাষ করেন। জুমচাষের জন্য প্রতিবছর স্থান পরিবর্তন করায় সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধাও পান না তাঁরা। বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে উদ্বাস্তু আদিবাসীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। এ ব্যাপারে সরকারের পূর্ণ হস্তক্ষেপ কামনা করছি। পাহাড়ী আদিবাসীরাও বাংলাদেশের নাগরিক। নাগরিক হিসাবে এরা সব মৌলিক অধিকার পাওয়ার দাবী রাখে। তাদের জীবনযাত্রার স্বাভাবিক মান উন্নোয়ন,শিক্ষার,চিকিৎসা সেবার মান উন্নোয়ন ও সার্বিক মান উন্নয়নের প্রতি লক্ষ্য রাখতে ও উন্নয়ন প্রকল্প- নীতি কার্যকর করতে নেত্রকোনা এলাকার নেতৃবৃন্দ ও সরকারের প্রতি আহবান করা হলো।

