পেডেলের ঘূর্ণিতে চলে আট জনের জীবন!
প্রিয়ন্ত মজুমদার, মুরাদনগর (কুমিল্লা) প্রতিনিধিঃ “বাবা মানেই হাজার বিকেল আমার ছেলেবেলা, বাবা মানেই রোজ সকালে পুতুল-পুতুল খেলা” ।কমবেশি সকলেই এই গানের কলির সাথে পরিচিত। বাবাদের পরিহার্যতাই বোঝানো হয়েছে এই গানে।তবে, সকলের জীবন ছন্দময় হয় না।গতকাল বাবা দিবসে তেমনি এক অদম্য বাবার সঙ্গে পরিচয় মেলে। মধ্যদুপুর , আকাশ মেঘের কোলে দিয়েছে ডুব। কখনো ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি। আবার কখনো ঝুম। আর তাতেই কাকভেজা কালাম। পুরো নাম কালাম মিয়া। বয়স পেরিয়েছে চল্লিশের ঘরে। মহাজনের কাছ থেকে রিকশা নিয়ে প্রতিদিনের মতো গতকাল রবিবারও ঘর থেকে বেরিয়েছেন সেই সাতসকালে। এতক্ষণে রিক্সার পেডেল মারতে-মারতে হাঁপিয়ে উঠেছেন। মুখাবয়বে বিষণ্নতা আঁকা। উপজেলা আল্লাহু চত্বরের সামনে এসে এক যাত্রীকে নামালেন। বৃষ্টিতে ভিজতে পারে, তাই ভাড়ার কচকচে দুটি ২০ টাকার নোট পরম যত্নে রাখলেন পলিথিনে মোড়ানো সিগারেটের প্যাকেটে।
এই বয়সে এমন বর্ষণমুখর দিনে রিকশা নিয়ে বের হওয়ার কারণ জানার চেষ্টা করতেই দুই চোখ ছলছল করে ওঠে কালামের। ভেজা শরীরে কাঁপতে কাঁপতে বলতে থাকেন, ‘ঘরে পাঁচ ছেলে এক মেয়ে। দুই ছেলে মাদ্রাসায় পড়ে বাকিরা পরে স্কুলে। ঘরে থাকা বউ তাদের দেহাশুনা করে। সংসারে কামাই করুইন্না আমি একজন। ঝড়-তুফান যা আসুক, রিকশা চালাইয়া ঘরে তো সদাই নিতে অইব।’
এ রকম বাবা, কালাম মিয়ার জন্যই গতকালের দিনটি। বাবা থাকুক কাছে, দূরে কিংবা পরপারে। গতকাল ছিল বাবা দিবস। তাই দিনটি ছিল বাবাদের। দেশভেদে ‘বাবা’ শব্দটি নানা অর্থে কঠোর হলেও সন্তানের জন্য পরম মমতা ও আগলে রাখার ছবি বিশ্বজুড়ে একই রংতুলিতে আঁকা। বাবার প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা জানাতে প্রতিবছরের জুনের তৃতীয় রবিবার ১১০টিরও বেশি দেশে উদযাপিত হয় দিনটি। বাংলাদেশেও ছড়িয়েছে বাবা দিবসের রং।
সেই কালামের গল্প : জন্মের পর থেকেই দরিদ্রতার সঙ্গে ‘বন্ধুতা’ কালাম মিয়ার। জীবনের যেটুকু পথ হেঁটেছেন এই বাবা লড়েছেন। আজও থামছে না সেই লড়াই। দাম্পত্য জীবনে পাঁচ ছেলে এক মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে কোনোরকম দিনযাপন করছেন সে। উপজেলার দিলালপুর গ্রামে তার বাড়ি। রাস্তায়-রাস্তায় রিকশার পেডেল ঘুরালেও মন পড়ে থাকে সংসারের ভালোবাসার অভিধানে। কখন কী হয়ে যায়, সেই চিন্তায়। তার পরও সন্তানদের সাধ্যমতো ভালো রাখতে রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে শরীর নোনা জলে ভেজাচ্ছেন। কুমিল্লার মুরাদনগরের দিলালরপুর গ্রামের কালামিয়ার তিন চাকার সঙ্গে সখ্য গড়েছেন কিশোর বয়সেই।
কালাম মিয়া বলেন, বাইরে শত কষ্ট করে দিনপার করলেও সন্তানদের সামনে হাসি-খুশি থাকি। আর তাদের বুঝাই, মানুষ চিরদিন পৃথিবীতে বাঁইচা থাকে না। তাদের কাছেও একটা মোবাইল দিছি, ঘণ্টা দুয়েক পরপরই কল দেয় তারা, আমিও কল দেই। কোথায় আছি জানাচ্ছি। ঝড় বাদলের দিন সাবধানে দরজা-জানালা দিয়ে ঘরে থাকার কথা বলছি। কী আনতে অইব বলছি। এভাবে তাদের ছায়াদিয়া রাখছি। করোনায় দেড় বছর ধইরা স্কুল বন্ধ, তাই বাসায় বন্দি।’ তিনি আরো বলেন, ‘এখন আমার স্বপ্ন একটাই, যত দিন পরিশ্রম করতে পারি তাদের পড়াশোনা করাইব।

