নববর্ষকে ঘিরে প্রাণচাঞ্চল্যে মুখর নাটোরের মৃৎশিল্প পল্লী, ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা

Share the post

আরিফুল ইসলাম নাটোর প্রতিনিধি:বাংলা নববর্ষকে সামনে রেখে নাটোরের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প পল্লীগুলোতে বইছে উৎসবের আমেজ। বছরের অন্য সময়ের তুলনায় এখন যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে এসব পল্লী। নতুন বছরের আগমনী বার্তা ঘিরে মাটির তৈরি নান্দনিক ও ব্যবহারিক পণ্যের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দিন-রাত নিরলস পরিশ্রমে ব্যস্ত সময় পার করছেন মৃৎশিল্পীরা।

জেলা শহরসহ আশপাশের বিভিন্ন মৃৎশিল্প পল্লী ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি ঘরেই চলছে কর্মযজ্ঞ। কোথাও মাটি কাঁদা হচ্ছে, কোথাও চাকার ঘূর্ণনে আকার নিচ্ছে হাড়ি-পাতিল, আবার কোথাও রোদে শুকানো বা চুলায় পোড়ানোর কাজে ব্যস্ত কারিগররা। মাটির সাদামাটা দলা যেন শিল্পীদের নিপুণ হাতে পরিণত হচ্ছে আকর্ষণীয় পণ্যসামগ্রীতে। শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সী কারিগরই এই ব্যস্ততায় অংশ নিচ্ছেন।
মৃৎশিল্পীরা জানান, পহেলা বৈশাখ তাদের জন্য বছরের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক মৌসুম। বিশেষ করে মাটির তৈরি রঙিন মুখোশ, বৈশাখী পুতুল, ফুলদানি, শোপিস, ব্যাংক (মানি ব্যাংক), হাড়ি-পাতিল এবং ঘর সাজানোর নানা উপকরণের চাহিদা এই সময় ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। গ্রাম থেকে শহর—সবখানেই এসব পণ্যের কদর রয়েছে।
স্থানীয় এক  অভিজ্ঞ মৃৎশিল্পী অমল বলেন,
“বৈশাখ আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। সারা বছর যেটুকু আয় হয় না, এই সময় সেটার ঘাটতি অনেকটা পুষিয়ে নেওয়া যায়। এখন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করতে হচ্ছে।”
আরেক কারিগর বিন্তি রানী জানান, কাঁচামাল যেমন মাটি, রং, জ্বালানি কাঠসহ অন্যান্য উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও বেড়েছে। তবুও ঐতিহ্য রক্ষার তাগিদে এবং জীবিকার প্রয়োজনে তারা এই পেশা ধরে রেখেছেন।
“আগের মতো লাভ হয় না, কিন্তু এই কাজই আমাদের পরিচয়। তাই কষ্ট হলেও ছাড়তে পারি না,”—যোগ করেন তিনি।
শুধু উৎপাদনই নয়, বিক্রির ক্ষেত্রেও দেখা গেছে বাড়তি উৎসাহ। ক্রেতারা ভিড় করছেন মৃৎশিল্প পল্লীগুলোতে। অনেকে পরিবার নিয়ে এসে পছন্দমতো সামগ্রী কিনছেন। আবার অনেকেই আগেভাগেই অর্ডার দিয়ে রাখছেন নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী পণ্য। শহরের দোকানদাররাও পাইকারিভাবে এসব পণ্য সংগ্রহ করছেন।
 ক্রেতা মোঃ আতিকুর রহমান আতিক ও তিথি দেব বলেন,
“বৈশাখ মানেই একটু আলাদা সাজ। মাটির জিনিস দিয়ে ঘর সাজালে একটা অন্যরকম অনুভূতি আসে। তাই প্রতি বছর এখান থেকেই কিনতে আসি।”
সংস্কৃতিমনা ব্যক্তিরা মনে করেন, মৃৎশিল্প শুধু একটি জীবিকা নয়, এটি বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। আধুনিকতার ছোঁয়ায় অনেক ঐতিহ্যবাহী পেশা হারিয়ে গেলেও মৃৎশিল্প এখনও টিকে আছে মানুষের ভালোবাসায়। তবে এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সরকারি সহায়তা, সহজ ঋণ সুবিধা, আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং বাজারজাতকরণের সুযোগ বৃদ্ধি।
স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীরা বলছেন,
“মৃৎশিল্পীদের জন্য স্থায়ী প্রদর্শনী কেন্দ্র, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করা গেলে এই শিল্প আরও সমৃদ্ধ হবে এবং নতুন প্রজন্মও আগ্রহী হবে।”
নববর্ষকে ঘিরে নাটোরের মৃৎশিল্প পল্লীগুলোর এই ব্যস্ততা শুধু উৎসবের প্রস্তুতিই নয়, এটি গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন প্রাণ সঞ্চার করছে। একই সঙ্গে এটি নতুন প্রজন্মকে বাঙালির শিকড় ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত করিয়ে দিচ্ছে।
বাংলা নববর্ষের আনন্দ আর ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে নাটোরের মৃৎশিল্প যেন হয়ে উঠেছে এক অনন্য সাংস্কৃতিক প্রতীক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Releated

মহাসড়ক দখল করে ভুট্টা মাড়াই, নলডাঙ্গায় দুইজনকে জরিমানা

Share the post

Share the post মহাসড়ক দখল করে ভুট্টা মাড়াই, নলডাঙ্গায় দুইজনকে জরিমানা নাটোর প্রতিনিধি: নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার পৌরসভাধীন নাটোর-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়কের মহিষমারি ব্রিজ এলাকায় মহাসড়ক দখল করে ভুট্টা (শস্য) মাড়াই করার দায়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে দুই ব্যক্তিকে জরিমানা করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২১ জুলাই) দুপুর ২টার দিকে মহিষমারি ব্রিজ এলাকায় এ অভিযান পরিচালনা করেন নলডাঙ্গা উপজেলার […]

নাটোরে নারী নেতৃত্বের উত্থান: সংরক্ষিত আসনে বিএনপির মনোনয়নে আন্না মিনজ ও সানজিদা তুলি

Share the post

Share the postআরিফুল ইসলাম নাটোর প্রতিনিধি:জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনে বিএনপির ঘোষিত ৩৬টি আসনের মধ্যে স্থান করে নিয়েছেন নাটোরের দুই নারী নেত্রী—ওঁরাও সম্প্রদায়ের আন্না মিনজ এবং ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেত্রী সানজিদা ইয়াসমিন ওরফে তুলি। এ মনোনয়নের মধ্য দিয়ে নাটোর জেলায় নারী নেতৃত্বের নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। নাটোর জেলার চারটি সংসদীয় […]