উত্তর হালিশহর ওয়ার্ড : ৮ জনই কাউন্সিলর হতে চান!

চট্টগ্রাম : সাগরের কুল ঘেঁষে নগরীর ২৬নং উত্তর হালিশহর ওয়ার্ড। বাকি ওয়ার্ডগুলোর মতো এখানে নেই তেমন যান্ত্রিকতা। সুন্দর ও নান্দনিক ওয়ার্ড গঠনে ৫ দশমিক ২৪ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ ওয়ার্ড থেকে মনোনয়ন চাইছেন বিভিন্ন দলের আটজন।
কেবল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন চান পাঁচজন। আর বিএনপি থেকে দুইজন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে লড়তে চান একজন।
ওয়ার্ডের ভোটারদের অভিযোগ, এলাকায় শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে না ওঠার কারণে এলাকার কর্মসংস্থান প্রত্যাশীদের ছুটতে হয় নগরীর বিভিন্ন জায়গায়। হতাশায় দিন কাটে কর্মসংস্থান প্রত্যাশীদেরও। এছাড়া এ ওয়ার্ডটি নিম্নাঞ্চল হওয়ায় জলাবদ্ধতা নিরসনও জনপ্রতিনিধিদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
আজ-কালের মধ্যে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার কথা রয়েছে। অবশ্য আরও আগে থেকে শুরু হয়েছে নির্বাচনের ক্ষণগণনা। এতে প্রার্থীদের মাঝেও বেড়েছে প্রচার-প্রচারণার ব্যস্ততা। দেওয়া হচ্ছে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুড়ি। এলাকায় কর্মসংস্থান তৈরি এবং নান্দনিক ওয়ার্ড গঠনে ভূমিকা রাখার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন মনোনয়ন প্রত্যাশীরা।
আওয়ামী লীগের হয়ে যারা লড়তে চান তারা হলেন উত্তর হালিশহর ওয়ার্ডের তিনবার নির্বাচিত কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র মোহাম্মদ হোসেন, ২৬ নং উত্তর হালিশহর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নাজিমুল ইসলাম মজুমদার, চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি রেজাউল আলম রনি, ২৬ নং উত্তর হালিশহর ওয়ার্ড ইউনিট আওয়ামী লীগের সদস্য লায়ন মোহাম্মদ ইলিয়াস, হালিশহর এ ইউনিট ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি রাজু আহমেদ।
অন্যদিকে, বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীরা হলেন বর্তমান কাউন্সিলর মো. আবুল হাসেম, চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য মহসীন আলী চৌধুরী। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) হালিশহর থানার সভাপতি ও মানবাধিকার কর্মী এমদাদুল করিম সৈকত।
এ প্রসঙ্গে উত্তর হালিশহর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র মোহাম্মদ হোসেন বলেন, সুখে-দুঃখে সবসময় নির্বাচনী এলাকার মানুষের পাশে ছিলাম, আছি। এ কারণে এলাকার মানুষ আমাকে বারবার নির্বাচিত করেছেন। বর্তমানে মাদকের ভয়াবহ থাবা থেকে মুক্তি পেতে চায় ওয়ার্ডের জনগণ। জনগণের এই চাওয়া পূর্ণ করতে চাই ফের কাউন্সিলর হয়ে।
জলাবদ্ধতা এবং সাগরের কুলঘেঁষে গড়ে ওঠা এ ওয়ার্ডটির পাশে বে-টার্মিনাল একটা বড় সম্ভাবনা, যা আমাদের এলাকার বাণিজ্য প্রসারের পাশাপাশি কর্মসংস্থানে ভূমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি। আমি কাউন্সিলর নির্বাচিত হলে এই সম্ভাবনার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহারের করার চেষ্টা করবো। বলেন মোহাম্মদ হোসেন।
বর্তমান কাউন্সিলর মো. আবুল হাসেম বলেন, এ ওয়ার্ডের জনগণ গতবার আমাকে ম্যানডেট দিয়ে কাউন্সিলর নির্বাচিত করেছেন। ওয়ার্ডের যেসব উন্নয়ন-কার্যক্রম চলমান আছে, সেগুলোর ধারাবাহিকতা প্রয়োজন। বর্তমানে এ ওয়ার্ডে ২৬ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ চলচে। এগুলো শেষ হলে এলাকার চেহারা বদলে যাবে। উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য আমি আবারো জনগণের কাছে যাবো, যে কাজগুলো করেছি সেগুলো তুলে ধরবো। যেহেতু জলাবদ্ধতা নিরসনের কাজ সেনাবাহিনী করছে, তাদের কাছে আমি আমার প্রকল্প জমা দিয়েছি। মাদক নির্মূল পুরোপুরি করা না গেলেও সন্ত্রাসী কার্যক্রম আমার এলাকায় নেই। আমার এলাকায় বে-টার্মিনাল হলে ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য একটা জোন তৈরি হবে। এ এলাকায় ইতোমধ্যে বড় যানবাহনের সমাগম হচ্ছে। এতে মানুষ অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী হবে। এরই ধারাবাহিকতায় সংযোগ সড়কগুলো করে দিচ্ছি যাতে মানুষের যাতায়াত সুবিধা বাড়ে। এলাকার মানুষ আমাকে পুনরায় নির্বাচিত করলে আমার পক্ষে সম্ভব উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে এলাকার মানুষকে সার্বিক দেওয়া।
কাউন্সিলর হতে আগ্রহী উত্তর হালিশহর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নাজিমুল ইসলাম মজুমদার একুশে পত্রিকাকে বলেন, আগেভাগে অনেকে বলেন ‘এই করবো, সেই করবো’ কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয় না। ওয়ার্ডকে মাদকমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত, একজনের সাথে আরেক জনের হানাহানি না হয়, দলমত নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে সুন্দরভাবে পরিচালনা করবো এলাকার মানুষ যদি আমাকে কাউন্সিলর নির্বাচিত করেন।
তিনি বলেন, আমাদের ওয়ার্ডে কখনো বি-ব্লকের প্রার্থী ছিল না। এই ব্লক থেকে কাউন্সিলর নির্বাচিত হলে জলাবদ্ধতা নিরসন করা সম্ভব জানিয়ে তিনি বলেন, হালিশহরের চারটি ইউনিটের মধ্যে বি-ব্লক একটি্। পাকিস্তান আমল থেকে বি-ব্লকে কোনো কাউন্সিলর পায়নি। তাই সবার সম্মিলিত সহযোগিতায় এবার নির্বাচিত হতে পারলে নালা ড্রেন পরিষ্কার রেখে জলবদ্ধতা নিরসনে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাব।
চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি রেজাউল আলম রনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, মডেল ওয়ার্ড গড়ে তোলার অঙ্গীকারে কাউন্সিলর হতে চাই। ছাত্ররাজনীতি করতে গিয়ে মানুষের সাথে মেশার সুযোগ হয়েছে। মানুষের কল্যাণে কাজ করতে চাই। জনপ্রতিনিধি হলে তা বৃহৎ পরিসরে করা সম্ভব হবে আমার পক্ষে। কাউন্সিলর হতে চাই নিজের জন্য নয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে, মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে, অসহায় মানুষের দ্বারপ্রান্তে গিয়ে তাদের কষ্ট ভাগাভাগি করতে। নির্বাচিত হলে মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা এবং যারা বিপথগামী হয়ে গেছে তাদের পুনর্বাসনের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনাই হবে আমার প্রথম কাজ। বলেন রেজাউল আলম রনি।
কাউন্সিলর হতে ইচ্ছুক মোহাম্মদ ইলিয়াস বলেন, গতবার তিনজন আওয়ামী লীগের প্রার্থী হওয়াতে আমি এ ওয়ার্ডে কাউন্সিলর হতে পারিনি। আমি কাউন্সিলর হলে স্বাস্থ্য সচেতন একটা ওয়ার্ড হিসেবে গড়ে তুলবো। ফুলচৌধুরী পাড়া থেকে বি-ব্লকে আসার ব্রিজটি গত দুই বছরেও কোনো কুল-কিনার হয়নি। আমি নির্বাচিত হলে সেটা সমাধান করব। ৭১ জন পরিছন্নতাকর্মী থাকার পরও নালা নর্দমায় ময়লা পড়ে থাকে, কাউন্সিলর হলে এসব থাকবে না। ওয়ার্ড হবে পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্য ও পরিবেশবান্ধব।
কনজ্যুমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) হালিশহর থানার সভাপতি ও মানবাধিকার কর্মী এমদাদুল করিম সৈকত বলেন, চট্টগ্রাম শহর মেগাসিটি হলেও হালিশহর ওয়ার্ড এখনো স্যানিটেশন আওতায় আসেনি। তাই নির্বাচিত হলে আমার প্রথম কাজ হবে এ ওয়ার্ডকে স্যানিটশন আওয়াতায় নিয়ে আসা। হালিশহর সেফটি টাঙ্কি ব্যবহার না থাকার কারণে কিছু দিন আগেও জন্ডিসের মহামারিতে চারজন মারা গেছে। আমরা ক্ষতিপূরণের জন্য উচ্চ আদালতে রিট করেছি। এছাড়া পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ওয়ার্ড গড়তে বিডি ক্লিনকে নিয়েও কাজ করেছি। মাদকের পাশাপাশি জলবদ্ধতা নিরসন এবং আধুনিক ওয়ার্ড গড়ে তোলার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাবো।
চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য মহসীন আলী চৌধুরী বলেন, শিক্ষার কোনো পরিবেশ এখানে নেই। বিভিন্ন কৌশলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি রাস্তাঘাট উন্নয়ন ও ড্রেনেজ ব্যবস্থায় সমন্বিত কাজ করবো।
বর্তমান কাউন্সিলরকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, যেসব উন্নয়ন চিন্তা-ভাবনা করে আমরা বিএনপির প্রার্থীকে গতবার বিজয়ী করেছিলাম সেরকম কোন দৃশ্যমান উন্নয়ন আসলে হয়নি অথচ আমি নিজেই ওই নির্বাচেনর প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেছিলাম। এখন লজ্জাবোধ করি। শিক্ষা সম্পর্কে ওনার আরও ভালো চিন্তা ও সচেতনতা দরকার।
উত্তর হালিশহর ওয়ার্ডের স্থায়ী বাসিন্দা আবুল কালাম আজাদ একুশে পত্রিকাকে বলেন, একটা রাস্তা সংস্কারের নামে দীর্ঘদিন যে ভোগান্তি পোহাতে হয় তা থেকে আমরা মুক্তি চাই। উন্নয়ন যেন ভোগান্তির কারণ না হয়, সেদিকে জনপ্রতিনিধিদের খেয়াল রাখা উচিত। বছরের পর বছর একটা রাস্তা সংস্কারের নামে অবহেলায় পড়ে থাকে।
তরুণ ভোটার আসিফ সরকার বলেন, একে তো এ এলাকা নিচু, তার উপর এলাকায় তেমন শিল্প কারখানা নাই। তাই আমাদের মতো বেকার যুবকদের চাকরির সন্ধান করতে অন্য এলাকায় যেতে হয়। এলাকায় শিল্প কারখানা গড়ে তোলে বেকারত্বের মুক্তি দিতে পারবে এমন ব্যক্তিকে আমরা কাউন্সিলর চাই।

