হাতিয়া নদী ভাঙ্গন রোধে টেকসই ব্লকবাধ নির্মান এর দাবীতে মানববন্ধন

Share the post
সাব্বির ইবনে ছিদ্দিক,​হাতিয়া,নোয়াখালী প্রতিনিধি: ​”ত্রাণ চাই না, আমরা আমাদের পিতৃপুরুষের ভিটেমাটি ফিরে পেতে চাই। মেঘনার বুক থেকে আমাদের সোনার হাতিয়াকে বাঁচান!”
​এক বুক কান্না আর শেষ সম্বল হারানোর আর্তনাদ নিয়ে এভাবেই রাজপথে নেমে এসেছিল নোয়াখালীর ঐতিহ্যবাহী দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার হাজারো মানুষ। তীব্র নদী ভাঙনের গ্রাস থেকে নিজেদের জন্মভূমিকে রক্ষা এবং জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ব্লকবাঁধ নির্মাণের দাবিতে আজ শুক্রবার বিকেল ৪ ঘটিকায় হাতিয়া দ্বীপ সরকারি কলেজের সামনে এক বিশাল ও আবেগঘন মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। ‘হাতিয়া উন্নয়ন ফোরাম’-এর ব্যানারে আয়োজিত এই মানববন্ধনটি একপর্যায়ে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে এক অভূতপূর্ব গণজোয়ারে রূপ নেয়
​বিকালে আকস্মিক ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ব্যানার, ফেস্টুন আর প্ল্যাকার্ড হাতে দলে দলে মানুষ এসে জড়ো হতে থাকেন কলেজ রোডে। কারো চোখে ছিল শেষ সম্বলটুকু হারানোর আতঙ্ক, কারো বুকে ছিল বছরের পর বছর ধরে চলা অবহেলার ক্ষোভ। “হাতিয়া বাঁচাও, নদী ভাঙন রোধ করো”—এমন সব হৃদয়স্পর্শী স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। দ্বীপের অস্তিত্ব রক্ষার এই মানবিক আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে শরিক হন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, কৃষক ও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ
​মানববন্ধনে দাঁড়িয়ে বক্তারা তাদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও বেদনার কথা তুলে ধরেন। তারা বলেন, চারদিকে নদীবেষ্টিত হাতিয়া উপজেলাটি বছরের পর বছর ধরে তীব্র নদী ভাঙনের শিকার। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম এলেই মেঘনার নিষ্ঠুর করাল গ্রাসে বিলীন হয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার একর ফসলি জমি, মাথা গোঁজার ঠাঁই, স্বপ্নের বিদ্যালয়, ধর্মীয় উপাসনালয় এবং শত বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী বাজার। হাজারো পরিবার আজ নিজেদের সবকিছু হারিয়ে নিজ ভূমিতেই উদ্বাস্তু ও বাস্তুহারা হয়ে যাযাবরের মতো মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
​বক্তারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অস্থায়ী বালুর বস্তা বা জিও ব্যাগ ফেলে সাময়িকভাবে ভাঙন ঠেকানোর যে ব্যর্থ চেষ্টা করা হয়, তা জোয়ারের তীব্র স্রোতে খড়কুটোর মতো ভেসে যায়। কোটি কোটি টাকা খরচ হলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। এটি কোনো বিলাসী দাবি নয়, বরং হাতিয়ার প্রায় সাত লাখ মানুষের বেঁচে থাকার এবং অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার অন্তিম লড়াই। তাই অবিলম্বে আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে স্থায়ী ও টেকসই আরসিসি (RCC) ব্লকবাঁধ নির্মাণ করতে হবে
​মানববন্ধনের সমন্বয়ক ছাত্রনেতা আবদুল ওহাব বাবুলের পরিচালনায় এতে  প্রধান বক্তা হিসেবে আবেগঘন বক্তব্য রাখেন হাতিয়া উন্নয়ন ফোরামের সভাপতি ও সাবেক ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সভাপতি   এডভোকেট শাহ মোহাম্মদ মাহফুজুল হক চৌধুরী । তিনি সরকারের সংশ্লিষ্ট  উচ্চপর্যায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন,
​”হাতিয়া এ দেশের মানচিত্রে এক অনন্য ও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। কিন্তু নদী ভাঙন যেভাবে এই প্রাচীন দ্বীপকে গিলে খাচ্ছে, তাতে দ্রুত স্থায়ী ব্যবস্থা না নিলে অদূর ভবিষ্যতে দেশের মানচিত্র থেকেই হাতিয়া হারিয়ে যাবে। আমরা আর কোনো মিথ্যা আশ্বাস বা কালক্ষেপণ দেখতে চাই না। সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের কাছে আমাদের আকুল আবেদন—মানবিক দিক বিবেচনা করে অতি দ্রুত হাতিয়াকে রক্ষায় স্থায়ী ব্লকবাঁধের মেগা প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়ন করুন।
​তিনি আরও স্পষ্টভাবে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এই মানববন্ধন কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়; এটি হাতিয়ার লাখো মানুষের জীবন, জীবিকা ও জন্মভূমি বাঁচানোর অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন আরও তীব্র ও বেগবান করা হবে।
 আয়োজিত ​মানববন্ধনে আরও বক্তব্য রাখেন সামাজিক সংগঠনের নেতা মোঃ আবদুর রব জুয়েল , হাতিয়া দক্ষিণ ছাত্রশিবিরের সভাপতি মোঃ আশিকুল  ইসলাম, সামাজিক সংগঠক মোঃ আয়াত হোসেন, হাতিয়া পৌরসভা জামায়াত ইসলামীর আমির জনাব  মাওলানা  তাওফিকুল ইসলাম,হরণী ইউনিয়ন চেয়ারম্যান প্রার্থী  হাফেজ  মাওলানা তারিফুল মাওলা এবং শ্রমিক নেতা ওমর ফারুক
হাতিয়া দ্বীপ নিউ মার্কেটের ব্যবসায়ী মনিরুদ্দীন আশ্রাফ, হাদিয়া মাদ্রাসার ভাইস  প্রিন্সিপাল আবদুল কাইয়ুম
সহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
​মানববন্ধন শেষে একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল হাতিয়া দ্বীপ সরকারি কলেজের সামনে থেকে শুরু হয়ে দ্বীপের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। মিছিল শেষে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবর একটি স্মারকলিপি প্রদানের ঘোষণা দেওয়া হয়।
​নদী ভাঙনের শিকার ও উপস্থিত সাধারণ মানুষ সমস্বরে জানান, তারা সরকারের কাছে কোনো দয়া বা সাময়িক ত্রাণ চান না। তারা চান টেকসই নদীশাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে তাদের পিতৃপুরুষের স্মৃতিবিজড়িত শেষ ভিটেমাটিটুকু রক্ষা করতে। সোনার হাতিয়াকে দেশের মূল ভূখণ্ডের মানচিত্রে টিকিয়ে রাখতে সরকার এবার দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে—এমনটাই এখন পুরো হাতিয়াবাসীর একমাত্র এবং শেষ প্রত্যাশা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Releated

ঘোড়াঘাটে করতোয়ার ভাঙনের মুখে আশ্রয়ণ প্রকল্প ও শতাধিক বসতবাড়ি, আতঙ্কে দিন কাটছে বাসিন্দাদের।

Share the post

Share the postশাহারুল ইসলাম, ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর) প্রতিনিধি: দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে করতোয়া নদীর অব্যাহত ভাঙনে চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে একটি আশ্রয়ণ প্রকল্পসহ শতাধিক বসতবাড়ি। নদীর তীব্র ভাঙনে যেকোনো মুহূর্তে ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় দিন কাটছে তীরবর্তী মানুষের। ভাঙন আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন অসহায় পরিবারগুলো। উপজেলার বুলাকিপুর ইউনিয়নের কুলানন্দনপুর নাপিতপাড়া এলাকায় সরেজমিন গিয়ে এমন ভয়াবহ চিত্র দেখা […]

ফরিদপুরে বিএসটিআইর মোবাইল কোর্ট: ৩ প্রতিষ্ঠানে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা জরিমানা

Share the post

Share the postমো: মাহাবুব মিয়া, ফরিদপুর জেলা প্রতিনিধি : ফরিদপুর সদর উপজেলায় ভেজাল ও অনিয়মের বিরুদ্ধে পরিচালিত যৌথ মোবাইল কোর্টে তিনটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এ সময় মোট তিনটি মামলায় ১ লাখ ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় এবং অননুমোদিত খাদ্য রং জব্দ করে ধ্বংস করা হয়। মঙ্গলবার (২১ জুলাই ২০২৬) ফরিদপুর […]