সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ধুপাজানে রাতের আঁধারে বালু পাথর লুট
শফিকুল বারী, সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি : সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও জেলা প্রশাসনের কঠোর হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও সুনামগঞ্জের ইজারাবিহীন ধুপাজান চলতি নদী থেকে অবৈধভাবে বালু ও পাথর উত্তোলন থামানো যাচ্ছে না। স্থানীয় একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট রাতের আঁধারে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রতিদিন কোটি টাকার সরকারি সম্পদ পাচার করছে।
স্থানীয় প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তায় জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, রক্ষকই যদি ভক্ষকের ভূমিকা নেয়, তবে রাষ্ট্রের সম্পদ রক্ষা করবে কে।
গত ১৩ জুলাই সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন অবৈধ বালু ও পাথর উত্তোলন বন্ধে একটি গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। বালু ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন অনুযায়ী, কেবলমাত্র ইজারাপ্রাপ্ত বালুমহালগুলো থেকে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত বালু উত্তোলন করা যাবে। সূর্যাস্তের পর সব ধরনের বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আর যেসব মহাল ইজারা দেওয়া হয়নি, সেগুলো থেকে কোনোভাবেই বালু বা পাথর উত্তোলন করা যাবে না।
ধুপাজান চলতি নদীটি গত কয়েক বছর ধরে সরকারিভাবে ইজারা দেওয়া হয়নি। ফলে এখানে সব ধরনের বালু ও পাথর উত্তোলন আইনত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রশাসনের এই নিষেধাজ্ঞাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সক্রিয় রয়েছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। দিনের বেলা কিছুটা শান্ত থাকলেও, রাতের আঁধারে এই নদীতে নামে অবৈধ নৌকা লোড আনলোডের খেলা।
সরেজমিনে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সালুকাবাদ ইউনিয়নের চালবন পয়েন্টের পূর্ব দিকে মিনাজুড়ি ও বাদেটেক রাস্তার দুই পাশে গিয়ে দেখা যায় অবৈধ কর্মকাণ্ডের ভয়াবহ চিত্র। সিন্ডিকেট চক্রটি ধুপাজান চলতি নদীর বালি বিক্রির জন্য সেখানে নির্ধারিত অবৈধ ‘ঘাটলা’ বা ডিপো তৈরি করেছে। রাতের অন্ধকারে নদী থেকে তুলে আনা বালু ও পাথর নৌকাযোগে এসব ঘাটে এনে জমা করা হচ্ছে এবং পরবর্তীতে তা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাচার করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সিন্ডিকেটের ভয়ে কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পায় না। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন জানান, বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশকে একাধিকবার জানানো হলেও দৃশ্যত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
নদীতে সরকারি ইজারা নেই, তবুও প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার বালু লুট হচ্ছে। পুলিশ ও প্রশাসনের নাকের ডগায় এসব ঘটলেও তারা কেন নীরব, তা আমাদের বোধগম্য নয়।
এ বিষয়ে জানতে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও)-র মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বিষয়টি তিনি এক সাংবাদিকের মাধ্যমে শুনেছেন। খোঁজখবর নিয়ে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
অন্যদিকে, বিশ্বম্ভরপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি)-র কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, আমাদের কাছে তথ্য এসেছে, বিষয়টি দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার কেবল ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে বালু ও পাথর খেকো এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান অভিযান বা আইনি পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।
রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি পাহারা দেওয়া এবং আইন শৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্ব যাদের কাঁধে, তাদের এমন রহস্যজনক নীরবতা নিয়ে এলাকায় নানা গুঞ্জন সৃষ্টি হয়েছে। সচেতন মহলের মতে, দ্রুত এই অবৈধ বালু ও পাথর উত্তোলন বন্ধ করা না গেলে একদিকে যেমন সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে তীব্র ভাঙনের মুখে পড়বে আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা।
পরিবেশ ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় অনতিবিলম্বে ধুপাজান চলতি নদীতে টাস্কফোর্সের নিয়মিত অভিযান পরিচালনা এবং এই প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সুনামগঞ্জের নাগরিক সমাজ।

