মরণ ফাদে মানুষ মরতে বসেছে, উঠানে ধান চাষ

Share the post

যশোর প্রতিনিধি: যত দূর চোখ যায় শুধু পানি আর পানি। খেতের ফসল, ঘেরের মাছ—সবই কেড়ে নিয়েছে এই পানি। কেড়ে নিয়েছে থাকার জায়গাটুকুও।যশোরের অভয়নগর, মণিরামপুর, কেশবপুর, যশোর সদর, খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার ভবদহ অঞ্চলে অন্তত ৫২টি ছোট–বড় বিল আছে।যশোরের ভবদহ অঞ্চলে প্রায় সারা বছরই জলাবদ্ধতা লেগে থাকে! বড় বিলগুলো হলো বিল বোকড়, বিল খুকশিয়া, বিল কেদারিয়া, বিল কপালিয়া, বিল ডুমুর, বিল পায়রা ‍ও দামুখালীর বিল। গত সোমবার ও মঙ্গলবার বিল বোকড়, বিল কেদারিয়া, বিল ডুমুর, বিল ঝিকরা ও বিল খুকশিয়া সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, বিলগুলোতে শুধু পানি আর পানি। কোথাও কোনো ধানখেত চোখে পড়েনি। আছে কেবল শাপলা আর আগাছা।

ভবদহের জলাবদ্ধতা নিরসনে বহু কর্মপরিকল্পনা নেয়া হলেও ভবদহবাসীর দুঃখ যেন কিছুতেই কাটতে চাইছে না। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এ পুরনো সমস্যার সমাধানের দাবি দীর্ঘদিনের। কিন্তু তিন দশকের বেশি সময় পার হলেও ভবদহবাসীর দুর্দশা নিরসন করা যায়নি।‘জোয়ারধার’ চালু করে ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসন করা গিয়েছিল। বর্তমানে ভবদহের জলাবদ্ধতা নিরসনে এলাকার কোনো বিলে ‘জোয়ারধার’ (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট-টিআরএম) কার্যকর নেই।বহু গবেষণা-বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণ করে ভবদহ জলাবদ্ধতা সমস্যার অন্যতম সমাধান হিসেবে ‘জোয়ারধার’ পদ্ধতিকে বেছে নেয়া হয়েছিল।

অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর কৃষি সম্প্রসারণ দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা তিনটির ভবদহ অঞ্চলে প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ হয়। তবে জলাবদ্ধতায় এবার মনিরামপুরে ১ হাজার ৬০০ হেক্টর, অভয়নগরে ১ হাজার ২৫০ হেক্টর ও কেশবপুরে ১ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হচ্ছে না।

কয়েকটি গ্রামের কৃষকের সাথে কথা বলে জানা যায়।হাটগাছা গ্রামের সুকৃতি মন্ডলের সাথে কথা বলে জানা যায়, তাদের বাড়ির উঠানের জল সরে গেলেও, তাদের কোনো জমিতে ধান চাষ করা যায়নি। পুরো বছর চলবে কি করে। না খেয়ে মরতে হবে। মহিষদিয়া গ্রামের নিতাই মল্লিক জানান, উঠানে এখন জল, ধান তো হবেই না বিলে মাঝা সমান জল। অল্প জায়গায় বাড়ির উঠানে ধান চাষ করেছি। বাজেকুলটিয়া গ্রামের সুনীল বিশ্বাসের ছেলে প্রদীপ বিশ্বাস জানান,আমার অল্পটুকু জমি, সেটুকুতেও ধান হচ্ছে না। বিলের পানিতে থৈথৈ করছে। ডুমুরতলা গ্রামের শিবপদ বিশ্বাস জানান, আমার বাড়ির পাশে জল, যতটুকু জমি আছে তাতে তো ধান হবেই না। আমার বাড়ির আশেপাশের কারো ধান হচ্ছে না।

তবে বিল কেদারিয়া ও বিল খুকশিয়ার ওপরের অংশে কিছু ধানখেত দেখা গেছে। বিলসংলগ্ন মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদী শুকিয়ে সরু খালের মতো হয়ে গেছে। বিএডিসি (বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন) এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), ভবদহ জলাবদ্ধতা নিষ্কাশন কার্যক্রমের আওতায় ভবদহ স্লুইসগেটের (২১ ভেন্ট) ওপর ১৩টি বৈদ্যুতিক সেচযন্ত্র বসিয়ে পানি সেচ দিচ্ছে। স্লুইসগেটের সামনে শ্রী নদীতে চিরচিরে পানি। একটি এক্সকাভেটর দিয়ে নদীর মধ্যে নালা কাটা হচ্ছে। কিন্তু নদীতে পানি না থাকায় অধিকাংশ সময় সেচযন্ত্রগুলো বন্ধ থাকছে।কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পলি জমায় নদীর বুক বিল থেকে কিছুটা উঁচু হয়ে গেছে। ফলে নদী দিয়ে এখন আর পানি সরছে না। বিলের পানি বিলেই থেকে যাচ্ছে। বিলের বেশির ভাগ এলাকায় এখনো হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি। চলতি মৌসুমে বোরো চারা রোপণের সময় শেষ। গত বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাত বেশি হয়েছে। অভয়নগর ও মনিরামপুরের বিলসংলগ্ন অন্তত ৪০টি গ্রামে পানি ঢোকে। বৃষ্টির পানিতে এসব গ্রামের বেশির ভাগ বাড়িঘর, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পানিতে প্লাবিত হয়।

বাড়িঘর থেকে পানি নেমে গেলেও এলাকার বিলগুলো জলাবদ্ধ হয়ে রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবোর) খামখেয়ালিপনার কারণে তাদের এই অবস্থা।কেশবপুরের কৃষি কর্মকর্তা মহাদেব চন্দ্র সানা জানান, উপজেলায় ১ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হচ্ছে না।অভয়নগরের কৃষি কর্মকর্তা গোলাম ছামদানী জানান, ভবদহ অংশে বিলের অবস্থা খুবই খারাপ। ওই অংশে এবার ১ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ সম্ভব হয়নি।ভবদহ পানিনিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির উপদেষ্টা ইকবাল কবির বলেন, সমস্যা সমাধানে টিআরএমের (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট-জোয়ারাধার) কোনোই বিকল্প নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Releated

ঘোড়াঘাটে করতোয়ার ভাঙনের মুখে আশ্রয়ণ প্রকল্প ও শতাধিক বসতবাড়ি, আতঙ্কে দিন কাটছে বাসিন্দাদের।

Share the post

Share the postশাহারুল ইসলাম, ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর) প্রতিনিধি: দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে করতোয়া নদীর অব্যাহত ভাঙনে চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে একটি আশ্রয়ণ প্রকল্পসহ শতাধিক বসতবাড়ি। নদীর তীব্র ভাঙনে যেকোনো মুহূর্তে ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় দিন কাটছে তীরবর্তী মানুষের। ভাঙন আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন অসহায় পরিবারগুলো। উপজেলার বুলাকিপুর ইউনিয়নের কুলানন্দনপুর নাপিতপাড়া এলাকায় সরেজমিন গিয়ে এমন ভয়াবহ চিত্র দেখা […]

ফরিদপুরে বিএসটিআইর মোবাইল কোর্ট: ৩ প্রতিষ্ঠানে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা জরিমানা

Share the post

Share the postমো: মাহাবুব মিয়া, ফরিদপুর জেলা প্রতিনিধি : ফরিদপুর সদর উপজেলায় ভেজাল ও অনিয়মের বিরুদ্ধে পরিচালিত যৌথ মোবাইল কোর্টে তিনটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এ সময় মোট তিনটি মামলায় ১ লাখ ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় এবং অননুমোদিত খাদ্য রং জব্দ করে ধ্বংস করা হয়। মঙ্গলবার (২১ জুলাই ২০২৬) ফরিদপুর […]