নির্যাতন সইতে না পেরেই আত্মহত্যার পথ বেছে নেন শাহিনুর

Share the post
আশিকুর রহমান,নরসিংদী : নরসিংদী সদর উপজেলার আলোকবালি ইউনিয়নের নেকজানপুরে শ্বশুর বাড়ির দাবিকৃত যৌতুকের টাকা দিতে না পারায় স্বামী ও শ্বশুর-শাশুড়ি কর্তৃক নির্যাতনের বলি হয়েছেন শাহিনুর বেগম (২৪) নামে এক গৃহবধূর। এমনটাই অভিযোগ এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগী পরিবারের।গত ৬ সেপ্টেম্বর (শনিবার) শ্বশুর বাড়িতে তার মৃত্যু হয়। গৃহবধূর মরদেহ ময়নাতদন্তের পর তার বাবার বাড়িতে দাফন করেছেন স্বজনরা।
শাহিনুর বেগম উপজেলার করিমপুর ইউনিয়নের শ্রীনগর দড়িপাড়া গ্রামের তাঁত শ্রমিক বাবুল মিয়ার মেয়ে। এ ঘটনায় একই উপজেলার আলোকবালি ইউনিয়নের নেকজানপুর গ্রামের মোমেন মিয়ার ছেলে শরিফ মিয়া (৩০), হাসান মিয়ার স্ত্রী খাদিজা বেগম (৩০), শরিফ মিয়ার বাবা মোমেন মিয়া (৬০), হোসেন মিয়ার ছেলে জামাল মিয়া (৪৫) ও মোমেন মিয়ার ছেলে হাসান (৩৫) এর বিরুদ্ধে নিহতের মা আছমুতারা বেগম বাদী হয়ে নরসিংদী মডেল থানায় একটি আত্মহত্যা প্ররোচনা দায়ে মামলা দায়ের করেন। এ বিষয়ে নরসিংদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ এমদাদুল হক মামলার দায়ের ব্যাপারে নিশ্চিত করেন এবং এরা সকলেই ভিকটিম শাহিনুর বেগমের শ্বশুর বাড়ির লোকজন বলে জানান।
সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মেয়েকে হারিয়ে মা আছমুতারা বেগম ঘরের মেঝেতে প্রায় অচেতন অবস্থায় পড়ে রয়েছেন। চারদিক শোকাবহ বেদনাদায়ক অবস্থা। আশেপাশের কয়েক গ্রাম থেকে দলবেঁধে মহিলারা আসছেন শোকের সাথী হতে। বিলাপ আর দুঃখ প্রকাশ ছাড়া তাদের আর কোন ভাষা নেই। স্থানীয় ও স্বজন সূত্রে জানা যায়, বাবা বাবুল মিয়া নরসিংদী শহরের একটি পাওয়ালুম ফ্যাক্টরীতে তাঁত শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। তাদের পরিবারে রয়েছে ৩ মেয়ে ও ১ ছেলে। গরীবের সংসার। দিন এনে দিন খাওয়া পরিবার। পরিবারের একমাত্র উপার্জনশীল বাবার রোজগারের অর্থ দিয়ে কোনোমত চলে তাদের সংসার। এরই মাঝে বড় মেয়ে শাহিনুরকে ৪ বছর পূর্বে ধুমধাম করে বিয়ে দেন আলোকবালি ইউনিয়নের নেকজানপুর গ্রামের মোমেন মিয়ার ছেলে শরিফ মিয়ার সাথে।
বিয়ের পূর্বে সেছিলো বেকার। এক বছরের মাথায় শাহিনুরের কোলজুড়ে সাফওয়ান নামে একটি পুত্র সন্তান জন্ম নেন। স্ত্রী, সন্তান রেখে বিদেশে যাওয়ার আগ্রহ দেখান শরিফ। এতে সায় দেন শরিফের বাবা। ঋণ ও দার-দেনা করে দেড়বছর পূর্বে মালেশিয়া পারি জমান শরিফ। বিদেশে থেকে ঋণের টাকা পরিশোধের জন্য স্ত্রীকে বিভিন্নভাবে মানসিকভাবে অত্যাচার শুরু করেন। পাশাপাশি শ্বশুর বাড়ির লোকজনও শাহিনুরের উপরে নানা ধরণের নির্যাতন ও লাঞ্ছিত করতে থাকেন। এতকিছুর পরও একমাত্র পুত্র সন্তানের ভবিষ্যত চিন্তা করে শাহিনুর মুখ বুঝে সব সহ্য করেন। এনিয়ে দুই পরিবারের মাঝে বেশ কয়েকবার মনমালিন্য দেখা দেয়। সর্বশেষ শ্বশুর বাড়ি থেকে একমাত্র ছেলেকে সাথে নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে আসেন শাহিনুর। পরে উভয়ের মাঝে পারিবারিক  মীমাংসা হলে সবকিছু ভুলে আবার স্বামীর বাড়িতে ফিরে যান শাহিনুর। স্বামীর গৃহে ফিরার পরই আবার চলতে থাকে তার উপর পার্শবিক নির্যাতন। এতে যোগ দেয় সদ্য বিদেশ থেকে আসা স্বামী শরিফ মিয়া। সে স্বামী ও শ্বশুরের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে তাদের দাবিকৃত যৌতুকের টাকা থেকে গরীব বাব-মাকে চিরতরে মুক্তি দিতে মৃত্যুর পথ বেছে নেন।
নিহতের মা আছমুতারা বেগম বলেন, ৪ বছর আগে আমার মেয়ে শাহিনুর বেগমের সাথে আলোকবালির শরিফ মিয়ার সাথে বিয়ে হয়। তাদের সংসারে আড়াই বছরের একটি পুত্রসন্তান রয়েছে। বিয়ের পর থেকেই তারা আমার মেয়ের কাছে যৌতুক দাবি করে। মেয়ের সুখের কথা চিন্তা করে বিভিন্ন সময়ে কিছু টাকা ও জিনিসপত্র দেই। দেড়বছর আগে জামাইকে (শরিফ মিয়া) বিদেশ পাঠাবে বলে আমাদের কাছে ৫ লক্ষ টাকা দিতে বলে। আমরা তাদের কথামত টাকা দিতে না পারায় এনিয়ে আমাদের সাথে তাদের কিছুটা মনমালিন্যের সৃষ্টি হয়। পরে আমরা মেয়ের কথা চিন্তা করে জামাইয়ের বাবার হাতে নগদ ১ লক্ষ টাকা দেই। তারপরও তাদের মনভরে না। তারা আরও বাকি ৪ লক্ষ টাকা দিতে আমার মেয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং শারীরিক নির্যাতন করে। গত মাসের ১৯ তারিখে জামাই (শরীফ মিয়া) মালেশিয়া থেকে বাড়ীতে এলে আমার মেয়ের উপর নির্যাতন আরও বাড়িয়ে দেয়। গত শনিবার বিকেলে জামাইয়ের বড় বোন সখিনা আমাকে জানায় আমার মেয়ের বুক ব্যথা করছে। তাই তাকে আলোকবালি থেকে চিকিৎসার জন্য সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
এ কথা শুনে আমি ও আমার পরিবারের স্বজনরা হাসপাতালে গিয়ে দেখি কেও নেই। কোথায় আমার মেয়েকে নেওয়া হয়েছে তা জানতে চাইলে সে বলে আছে। পরে জানাচ্ছি। হাসপাতাল থেকে আমি জামাইয়ের বড় বোন সখিনার বাড়িতে গেলে তারা আমাকে তালবাহানা করে আটকে রাখে। পরে আমি সেখান থেকে আমার স্বামী ও শ্বশুর বাড়ির লোকজনকে খবর দিলে তারা খোঁজ নিয়ে জানতে পারে যে, শাহিনুর মারা গেছে। ঘটনার ওইদিনই আমার মেয়ের জামাই শরিফ  বিদেশে (মালেশিয়া) পালিয়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, আমরা গরীব মানুষ। দিন এনে দিন খাই। আমার মেয়ের হত্যাকারীদের বিচার চাই। এ বিষয়ে নরসিংদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ এমদাদুল হক বলেন, এ ঘটনায় থানায় হত্যা প্ররোচনা দায়ে একটি মামলা হয়েছে। আসামীদের দ্রুত গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশ বদ্ধপরিকর। এ ব্যাপারে পুলিশ কাজ করছে।এবিষয়ে অভিযুক্তদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তাদের বাড়িতে কাউকে পাওয়া যায়নি। তবে এলাকাবাসী জানান, ঘটনার পর থেকেই সবাই গা ডাকা দিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Releated

ধামরাইয়ে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটে বসতঘরে আগুন, ক্ষতি ২ লাখ টাকা

Share the post

Share the postমো: রিপন হোসেন,ধামরাই (ঢাকা) প্রতিনিধি : ঢাকার ধামরাইয়ে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে একটি বসতঘরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রায় দুই লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হলেও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। ফায়ার সার্ভিসের তৎপরতায় প্রায় চার লাখ টাকার মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে। বুধবার (২২ জুলাই) দুপুর ১২টা ৭ মিনিটে উপজেলার কুল্লা ইউনিয়নের পাল্লি এলাকায় এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা […]

মাগুরার শ্রীপুরে সাচিলাপুর বাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, ৩০ লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি

Share the post

Share the postজিল্লুর রহমান সাগর,মাগুরা প্রতিনিধি:মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী সাচিলাপুর বাজারে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে বাজারের একটি বড় ইলেকট্রনিক্স ও স্যানিটারি দোকান সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। প্রাথমিকভাবে এতে প্রায় ৩০ লক্ষাধিক টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে। গতকাল বুধবার (২২ জুলাই) রাত ১২টা ১০ মিনিটের দিকে সাচিলাপুর বাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মো: […]