করোনায় বেসরকারি শিক্ষক কর্মকর্তাদের জীবন জীবিকা
মোঃ শাহ্ নেওয়াজ মজুমদার,লেখক ও কলামিস্ট: করোনা ভাইরাস সংক্রমণের মধ্যে কঠিন সংকটে দিন কাটছে বেসরকারি ও নন
এমপিও ভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মরত শিক্ষক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের। এ সকলকর্মকর্তা ও শিক্ষকরা প্রতিষ্ঠানের আয় অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে মাসিক বেতন ও অন্যান্য ফি আদায় করেই তাদের বেতন ভাতা নিতেন।গত ১৭ই মার্চ ২০২০ থেকে বন্ধ আছে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শিক্ষা
প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও তেমন সমস্যা নেই সরকারি ও এমপিও ভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর। কারন সরকার সমূদয় বেতন ও উৎসব ভাতা পরিশোধ করছেন। তবে যত সমস্যানিজস্ব আয়ে চলা বেসরকারি ও প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোর । সম্প্রতিপ্রকাশিত একটি রিপোর্টে দেখা যায় এ সকল প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৬০ হাজারকিন্টার গার্ডেন (কেজি স্কুল) ইতিমধ্যে এর অধিকাংশ আর্থিক সঙ্কতের মধ্যেপড়ে বন্ধ হয়ে গেছে। এ ছাড়াও আছে আধা এমপিও ভুক্ত, বেসরকারি ও প্রাইভেট স্কুল সাত হাজার, পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট সহ বিভিন্ন ধরনের কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে পৌনে ১০ হাজার, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে ৯৬টি,বেসরকারি নন এমপিও ভুক্ত স্কুল কলেজ ও মাদ্রাসা আছে, এছাড়াও আছে শতাধিক ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
দেশের মাধ্যমিক শিক্ষার ৯৩শতাংশ শিক্ষার্থী পড়ছে বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে।
বেসরকারি উচ্চ মাধ্যমিক কলেজে পড়ছে ৯৫শতাংশ শিক্ষার্থী, এর মধ্যে আবারপুরোপুরি বেসরকারি কলেজে পড়ছে ৫২শতাংশ শিক্ষার্থী।
প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায়কৃত টিউশন ফি এর আয় থেকেপ্রতিষ্ঠানের ব্যয় নির্বাহের পর শিক্ষক কর্মচারীদের যৎসামান্য বেতন দেউয়া হয়। এরবাইরে এসব শিক্ষক প্রাইভেট পড়িয়ে কিছু আয় করেন এবং সব মিলিয়ে কোনরকমে জীবিকা নির্বাহ করেন। করোনার ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায়
শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টিউশন ফি অনেকাংশে আদায় বন্ধ, প্রাইভেট পড়ানো ওবন্ধ। আবার অধিকাংশ মধ্যবিত্ত ও নিন্ম আয়ের মানুষের আয়ের উৎস নস্ট হয়ে যাওয়াতারা তাদের বাচ্চাদের স্কুলের বেতন পরিশোধ করতে পারছেনা প্রাইভেট পড়ানো দুরেরকথা।এতে শিক্ষক কর্মকর্তারা অত্যন্ত মানবেতর জীবন যাপন করছে। বেঁছে থাকারতাগিদে বাধ্য হয়ে অনেকেই জীবিকা পরিবর্তন করছেন। ইতিমধ্যে বিভিন্নগনমাধ্যমে শিক্ষকদের দুর্দশার চিত্র কিছুটা উঠে আসছে। জাতি গড়ার কারিগরশিক্ষক সমাজের অনেকে পেটের দায়ে কৃষি কাজ করছেন, ভ্যান চলাচ্ছেন,ইজিবাইক চালাচ্ছেন, ফল ও সব্জি বিক্রি করছেন, ভেটেনারি ঔষধ বিক্রি করছেন,রাজমিস্ত্রির কাজ করছেন । শহর ছেড়ে অনেকে চলে গেছেন গ্রামে, কী করে সংসারচালাবেন এই চিন্তায় দিন দিন মুষড়ে পড়ছেন। বেসরকারি স্কুল কলেজ ওপলিটেকনিকের শিক্ষক কর্মকর্তারা। অর্থ বিত্ত না থাকলেও শিক্ষকদের সামাজিকমর্যাদা আছে,এ কারনে লজ্জায় তারা হাত পাততে পারছে না।
দেশে ৬০ হাজারের বেশি কিন্টার গার্ডেন স্কুল ছিল। এই স্কুল গুলোয় ৬ লাখের মতোশিক্ষক ও কয়েক লাখ কর্মকর্তা কর্মচারী ছিল। মার্চ ২০২০ থেকে স্কুল বন্ধ থাকায়শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টিউশন ফি আদায় করতে না পেরে স্কুল কতৃপক্ষ শিক্ষককর্মচারীদের বেতন ভাতা ও বাড়ি ভাড়া বিভিন্ন বিল পরিশোধ করতে না পেরেইতিমধ্যে অনেক স্কুল বিক্রি বা বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলে এসব স্কুলের কর্মচারীরাপেশা হারান ও নতুন পেশায় আত্ম নিয়োগ করেন।অনেক বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক কর্মকর্তারা করোনা মহামারীর প্রথমথেকেই অনলাইনে তাদের শিক্ষার্থীদের কে পাঠ্যক্রম এর সাথে যুক্ত রাখার জন্য অক্লান্তপরিশ্রম করে যাচ্ছেন। তারা ফেইসবুক, জুম, বøাইন্ডেড লার্নিং সিস্টেম (ইখঈ)অনেকে নিজস্ব সফটওয়্যার এর মাধ্যমে। তার পরেও প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানঅবহেলিত ও দুর্দশাগ্রস্ত ।দেশের সব ব্যবস্থা সচল রাখতে সরকারী বেসরকারি দুটো শিক্ষা ব্যবস্থারই প্রয়োজনআছে, কিন্তু দেশ ও জনগনের ক্রান্তিলগ্নে সরকারের কাছে সবাই নাগরিক। এখানেসরকারী বেসরকারি ব্যবস্থার মধ্যে বিভাজন না রেখে সমন্বয়ের মাধ্যমে এগিয়েআসতে হবে সরকারকে।কেননা সরকার জনগনের অভিভাবক। এই ক্রান্তি লগ্নেজাতির মেরদন্ড শিক্ষা ও শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্য থেকে যে সঙ্কটের জায়গায় এসেছে তারআশু সমাধান দেখা জরুরি হয়ে গেছে। এক্ষেত্রে দুটি বিষয় গুরুত্তের সংগে নিতেহবে:- ১, শিক্ষক কর্মকর্তাদের জীবন জীবিকা রক্ষা । ২, শিক্ষা কার্যক্রমে গতিসৃষ্টি করা। সাময়িক ও অসাময়িক দুটো দিকই মাথায় রাখতে হবে,সাময়িক ভাবে বেসরকারি ও প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক কর্মকর্তা কর্মচারীদের জন্য
আর্থিক প্রণোদনা জরুরি।
একজন শ্রমিক ও ভিখারি হাত পেতে কিছু নিতে পারে কিন্তু একজন শিক্ষক নিজেকে লুকিয়ে রাখেন , কাউকে বুঝতে দেন না যে তার
হাড়িতে খাবার নেই, ধার করতে গেলে লজ্জায় মুখ লুকাতে হয়, বাসা ভাড়া না দিতেপারলে লজ্জায় হেঁট হয়ে গ্রামের বাড়ীতে চলে যেতে হয়।তাদের দেখার জন্য প্রথমে দেয়া যেতে পারে আর্থিক প্রণোদনা, দ্বিতীয় পদ্ধতিহলো মাসিক বেতনের সমপরিমাণ অর্থ বিনা সুদে ঋণ হিসেবে দেওয়া যেতেপারে। গার্মেন্টস সহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে নানা ধরনের প্রণোদনা দেয়াহয়েছে। কিন্তু সব থেকে বড় লাভজনক বিনিয়োগ ক্ষেত্র শিক্ষা এর বাহিরে থেকে
গেছে। শুধু করোনাকালীন প্রণোদনাই নয় শিক্ষকদের উন্নয়নে নিতে হবে দুর্দশালাগবের টেকসই উদ্যোগ। সরকারেরে উচিত এখই উদ্যোগ নেয়া, না হলে
মেধাবিরা আর শিক্ষকতায় আসবেনা, পুরতনরা বের হয়ে অন্য পেশায় যোগ দিবে। যর প্রভাব পড়বে আমাদের জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার উপর ,সরকার ও অভিভাবকগন যদি এখনএগিয়ে না আসেন তাহলে, শিক্ষক কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাঁচবে না, আর
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না বাঁচলে শিক্ষার গোটা ব্যবস্থাই হুমকির মুখে পড়বে। ক্ষতিগ্রস্থ হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। অনেক মেধাবী শিক্ষক বেকার হয়ে যাবে।
এই করোনা আমাদেরকে অনেক কিছু শিখিয়েছে, অনেক দুর্বলতা ও বৈষম্যচোখে আঙ্ধসঢ়;গুল দিয়ে দেখিয়েছে, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার বৈষম্য ও দুর্বলতা গুলিআমরা বুঝতে পেরেছি। এ শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে এমন
ভাবে ঢেলে সাঁজাতে হবে ,যেন যত দুর্যোগই আসুক না কেন আমাদের শিক্ষক ওকর্মকর্তাদেরকে আর যেন এমন দুর্বিষহ জীবনযাপন করতে না হয়। দেশ গড়তেবেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবদান কোন অংশে কম নয়।
আমরা চাই শিক্ষা আর শিক্ষক যেন সমাজে অবহেলিত না হয়। শিক্ষক কর্মকর্তাশ্রেণিকে অবহেলার দিকে ঠেলে দিয়ে জাতীয় চেতনা ও মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত করাকিছুতেই কাম্য হতে পারে না। আপদকালীন সমস্যা সমাধানে সরকারি ওবেসরকারি উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয় আনা দরকার। আমাদের মানতে হবে শ্রম আরশিক্ষা সভ্যতার দুইটি ডানা একটি ছাড়া অন্যটি চলতে পারে না। আশা করিঅচিরেই শিক্ষক ও কর্মকর্তাগনের মর্যাদা সমুন্নত হবে। আমরা আরো মনে করিশিক্ষক বাঁচলে শিক্ষা বাঁচবে, শিক্ষা বাঁচলে সমাজ বাঁচবে।

