রায়পুরে ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শ্রমের মহোৎসব: শিশুদের হাতে ভারী যানবাহনের স্টিয়ারিং, ঘটছে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা

Share the post

আব্দুল্লাহ আল মামুন,রায়পুর(লক্ষ্মীপুর) প্রতিনিধি: লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলায় দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে শিশু শ্রম। বিশেষ করে ঝাড়ুদার, চায়ের দোকান কিংবা লেদ মেশিনের গণ্ডি পেরিয়ে শিশুরা এখন জড়িয়ে পড়ছে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পেশায়। উপজেলার বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কে আইনের তোয়াক্কা না করে প্রকাশ্যেই শিশুদের দিয়ে চালানো হচ্ছে ট্রলি ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার মতো ভারী ও ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন।

ফলে একদিকে যেমন বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি, অন্যদিকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট হচ্ছে কোমলমতি শিশুদের ভবিষ্যৎ।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রায়পুর পৌর শহরের বাস টার্মিনাল, বেড়িবাঁধ সড়ক, হায়দরগঞ্জ রোড, মোল্লারর হাট, চরবংশী  এবং মীরগঞ্জ এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ১২ থেকে ১৫ বছরের অসংখ্য শিশু চালকের আসনে বসে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মূল চালক পাশে বসে আরামে ঘুমাচ্ছেন বা ফোনে কথা বলছেন, আর স্টিয়ারিং সামলাচ্ছে এক অবুঝ শিশু। অতিরিক্ত উপার্জনের লোভে কিংবা সস্তা শ্রমের সুযোগ নিয়ে গাড়ির মালিক ও চালকরা এই শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত করছেন।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ে উপজেলার বিভিন্ন মহলের মানুষ ক্ষোভ ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দা (মো. কামাল হোসেন) বলেন, “রাস্তায় বের হলেই ভয় লাগে। ছোট ছোট ছেলেরা বড় বড় মালবাহী ট্রলি আর মাহিন্দ্রা চালাচ্ছে। এদের না আছে কোনো লাইসেন্স, না আছে কোনো অভিজ্ঞতা। একটু হর্ন দিলেই এরা ঘাবড়ে যায়, আবার কখনো বেপরোয়া গতিতে টান দেয়। রায়পুরে সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ এই শিশু চালকরা।”

একজন শিশু চালক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, বয়স ১৩ বছর) বলেন, “পরিবারে বাবা অসুস্থ, মা মানুষের বাড়িতে কাজ করে। পড়াশোনার খরচ চালানোর সামর্থ্য নাই, তাই বাধ্য হয়ে গ্যারেজে ঢুকেছিলাম। ওস্তাদ এখন আমাকে গাড়ি চালাতে দেয়। দৈনিক ২০০-৩০০ টাকা পাই, তা দিয়ে কোনোমতে সংসার চলে। জানি এটা রিস্কের কাজ, কিন্তু পেটের দায়ে করতে হচ্ছে।”

সচেতন নাগরিক ও সমাজকর্মী বলেন, মো. আরিফ হোসেন বলেন :”এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। যে বয়সে এই শিশুদের হাতে বই-খাতা থাকার কথা, সেই বয়সে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে মরণঘাতী যানবাহনের স্টিয়ারিং। সস্তা শ্রমের জন্য মালিকরা এদের ব্যবহার করছে। এভাবে চলতে থাকলে এই প্রজন্ম অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হবে। এখনই রাষ্ট্র ও সমাজকে কঠোর হতে হবে।”

পরিবহন নেতা/মালিক সমিতি (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা  জানান :”আমরা বারবার চালক ও মালিকদের নিষেধ করি অপ্রাপ্তবয়স্ক কাউকে গাড়ি না দিতে। কিন্তু অনেক সময় চালকরা অলসতা করে তাদের সহকারীদের (হেলপার) দিয়ে গাড়ি চালায়। আমরা এ বিষয়ে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেব এবং কোনো মালিক যদি শিশুদের গাড়ি দেয়, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, শিশু শ্রম বন্ধে এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে তারা নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছেন। তবে এটি পুরোপুরি বন্ধ করতে হলে সামাজিক সচেতনতা সবচেয়ে বেশি জরুরি। ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শ্রমের বিরুদ্ধে আগামী দিনগুলোতে আরও জোরালো অভিযান চালানো হবে এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে।

রায়পুরে শিশু শ্রম ও শিশুদের দিয়ে ভারী যানবাহন চালানো বন্ধ করতে হলে শুধুমাত্র প্রশাসনের অভিযানের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো দ্রুত নেওয়া প্রয়োজন- নিয়মিত তদারকি: ট্রাফিক পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে কঠোর চেকিং ব্যবস্থা করা। মালিকদের শাস্তি- যেসব মালিক শিশুদের হাতে গাড়ির চাবি তুলে দিচ্ছেন, তাদের লাইসেন্স বাতিল ও জরিমানা করা। ৩. পুনর্বাসন ও শিক্ষা- দরিদ্র পরিবারের শিশুদের শিক্ষার আলোয় ফিরিয়ে আনতে সরকারি ও বেসরকারিভাবে বিশেষ উপবৃত্তির ব্যবস্থা করা।

রায়পুরের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে এবং সড়ককে নিরাপদ করতে প্রশাসন, পরিবহন মালিক এবং সাধারণ জনগণকে এখনই ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসার দাবি জানিয়েছেন উপজেলার সর্বস্তরের মানুষ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Releated

ঘোড়াঘাটে করতোয়ার ভাঙনের মুখে আশ্রয়ণ প্রকল্প ও শতাধিক বসতবাড়ি, আতঙ্কে দিন কাটছে বাসিন্দাদের।

Share the post

Share the postশাহারুল ইসলাম, ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর) প্রতিনিধি: দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে করতোয়া নদীর অব্যাহত ভাঙনে চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে একটি আশ্রয়ণ প্রকল্পসহ শতাধিক বসতবাড়ি। নদীর তীব্র ভাঙনে যেকোনো মুহূর্তে ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় দিন কাটছে তীরবর্তী মানুষের। ভাঙন আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন অসহায় পরিবারগুলো। উপজেলার বুলাকিপুর ইউনিয়নের কুলানন্দনপুর নাপিতপাড়া এলাকায় সরেজমিন গিয়ে এমন ভয়াবহ চিত্র দেখা […]

ফরিদপুরে বিএসটিআইর মোবাইল কোর্ট: ৩ প্রতিষ্ঠানে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা জরিমানা

Share the post

Share the postমো: মাহাবুব মিয়া, ফরিদপুর জেলা প্রতিনিধি : ফরিদপুর সদর উপজেলায় ভেজাল ও অনিয়মের বিরুদ্ধে পরিচালিত যৌথ মোবাইল কোর্টে তিনটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এ সময় মোট তিনটি মামলায় ১ লাখ ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় এবং অননুমোদিত খাদ্য রং জব্দ করে ধ্বংস করা হয়। মঙ্গলবার (২১ জুলাই ২০২৬) ফরিদপুর […]