ভরা মৌসুমে নদীতে ইলিশের তীব্র সংকট দিশেহারা জেলেরা

Share the post

সাব্বির ইবনে ছিদ্দিক ,হাতিয়া (নোয়াখালী) প্রতিনিধি : আকাশ মেঘলা, নদীতে জোয়ারের টান—সব মিলিয়ে এখন ইলিশের ভরা মৌসুম। অন্যান্য বছর এই সময়ে হাতিয়ার উপকূলীয় ঘাটগুলো আড়তদার, পাইকার আর জেলেদের হাঁকডাকে মুখরিত থাকত। কিন্তু এবার চিত্র ভিন্ন। মেঘনা নদী কিংবা গভীর সমুদ্র—কোথাও কাঙ্ক্ষিত ইলিশ মিলছে না। দিনরাত সাগরে জাল ফেলেও শূন্য হাতে ফিরছেন জেলেরা। ঘাটে ঘাটে এখন কেবলই হতাশা আর লোকসানের হাহাকার।

​ভোররাতে যখন ট্রলারগুলো ঘাটে এসে ভেড়ে, তখন চারপাশের বাতাসে আনন্দের বদলে এক ধরনের নীরবতা দেখা যায়। ঝুড়িগুলো খালি পড়ে আছে, বরফ গলে পানি হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তাতে সাজানোর মতো মাছ নেই।

সূর্যমুখী ঘাটে ট্রলার নোঙর করে ক্লান্ত শরীরে নামছিলেন আবু সায়েদ মাঝি। কপালে চিন্তার ভাঁজ নিয়ে তিনি বলেন, ৩০ বছর সাগরে কাডাইলাম, এমন দশা আর দেহি নাই। লাখ টাকা দেনা-কর্জ করি তেল-চাল লই সাগরে গেছিলাম। সাত দিন ধরি তুফানের মইদ্দে পইড়া রইছি। যে মাছ পাইছি, তা বেচি ট্রলারের তেলের খরচও উঠতো ন। বাড়িত পোলাপাইন চাহিয়া রইছে, তাগো মুখে কী দিমু, হেই চিন্তায় মাথা ঘোরে।”

​অনুরূপ কষ্টের কথা জানালেন আমতলীঘাটের জামাল মাঝি। শূন্য ট্রলারের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, “মহাজনের তন চড়া সুদে টাকা নিছি, কিস্তির ওপর টাকা তুলি ট্রলারে তেল ভরছি। ভাবছিলাম মাছ পামু, দেনা শোধ করমু। কিন্তু আল্লায় চাইল না। সাগরে জাল টানি আর বুকটা ফাইট্টা যায়, জালে ইলিশের দেখা নাই। এখন খালি হাতে ফিরা আইছি, মহাজনের পাওনা ক্যামনে দিমু আর পরিবারের মুখে কী তুলে দিমু, হেই চিন্তায় চোখে অন্ধকার দেখতাছি।

​শুধু আবু সায়েদ কিংবা জামাল মাঝি নন; বউ বাজারঘাট, বাংলাবাজার ঘাট, নলচিরা ঘাট, চেয়ারম্যানঘাট, দানারদোল ঘাট ও কাদিরারঘাটসহ পুরো হাতিয়া উপকূলের হাজার হাজার জেলে পরিবারের অবস্থা এখন একই। ইলিশের ওপর ভরসা করেই এই অঞ্চলের অর্থনীতি সচল থাকে।

কিন্তু মৌসুমের শুরুতে চড়া সুদে নেওয়া দাদন ও এনজিওর কিস্তির টাকা এখন জেলেদের গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকের ঘরে ঠিকমতো চুলা জ্বলছে না। পাওনাদারদের ভয়ে অনেক জেলে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াতে হবে

​যে আড়তগুলো চব্বিশ ঘণ্টা কোটি টাকার ইলিশ কেনাবেচায় জমজমাট থাকত, সেখানে এখন সুনসান নীরবতা। সূর্যমুখীঘাটের ‘দিনার ফিশ এন্টারপ্রাইজ’-এর মালিক মো. দিদার উদ্দিন বলেন, “মৌসুমের এই সময়ে আড়ত মাছের অভাবে ফাঁকা পইড়া রইছে। লাখ লাখ টাকা দাদন (অগ্রিম ঋণ) দিয়া রাখছি জেলেদের, কিন্তু তারা মাছই পাইতাছে না তো আমারে দেবে কোথায় থেকে? ট্রলারপ্রতি যে খরচ, সেই তুলনায় চার ভাগের এক ভাগ মাছও ঘাটে নামতাছে না। বেচাকেনা নাই, আড়তের খরচ চালানোই দায় হয়া পড়ছে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে আমাগো মতো ব্যবসায়ীদের গদি গুটিয়ে রাস্তায় বসা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না

​মৎস্য কর্মকর্তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণ ব্যাহত হচ্ছে। নদীতে ডুবোচর সৃষ্টি হওয়া, সঠিক সময়ে বৃষ্টি না হওয়া এবং সাগরের পানির তাপমাত্রা ও লবণাক্ততা বদলে যাওয়ার কারণে ইলিশ গভীর সমুদ্র ছেড়ে উপকূলের দিকে আসছে না। এছাড়া মোহনা অঞ্চলের দূষণও এর জন্য দায়ী।স্থানীয়দের দাবি, এই সংকটময় মুহূর্তে জেলেদের টিকিয়ে রাখতে হলে কেবল জলবায়ুর দোহাই না দিয়ে সরকারিভাবে বিশেষ পুনর্বাসন প্যাকেজ, সহজ শর্তে ঋণ এবং জরুরি খাদ্য সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। তা না হলে উপকূলের এই বৃহৎ জনগোষ্ঠী চরম মানবিক সংকটে পড়বে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Releated

পাবিপ্রবিতে র‍্যাগিংয়ের অভিযোগ, গুরুতর অবস্থায় শিক্ষার্থী মেডিকেলে প্রেরণ

Share the post

Share the postপাবিপ্রবি প্রতিনিধি:পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পাবিপ্রবি) ফার্মেসি বিভাগের ২০২৪–২৫ শিক্ষাবর্ষের (১৭ ব্যাচ) কয়েকজন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের (১৮ ব্যাচ) নবীন শিক্ষার্থীদের র‍্যাগিংয়ের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী নবীন শিক্ষার্থীর নাম মুশফিকুর রহমান তুহিন। অভিযুক্ত সিনিয়র শিক্ষার্থীরা হলেন ফার্মেসি বিভাগের সোহানুর, সাকিব, জাহিদ, তানিম, ইউনুস, মুশফিক ও সাইদুরসহ আরও কয়েকজন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মঙ্গলবার […]

ঘোড়াঘাটে করতোয়ার ভাঙনের মুখে আশ্রয়ণ প্রকল্প ও শতাধিক বসতবাড়ি, আতঙ্কে দিন কাটছে বাসিন্দাদের।

Share the post

Share the postশাহারুল ইসলাম, ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর) প্রতিনিধি: দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে করতোয়া নদীর অব্যাহত ভাঙনে চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে একটি আশ্রয়ণ প্রকল্পসহ শতাধিক বসতবাড়ি। নদীর তীব্র ভাঙনে যেকোনো মুহূর্তে ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় দিন কাটছে তীরবর্তী মানুষের। ভাঙন আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন অসহায় পরিবারগুলো। উপজেলার বুলাকিপুর ইউনিয়নের কুলানন্দনপুর নাপিতপাড়া এলাকায় সরেজমিন গিয়ে এমন ভয়াবহ চিত্র দেখা […]