গাজীপুরে কোটি টাকার সড়ক ধস, মান নিয়ন্ত্রণে চরম অব্যবস্থাপনার অভিযোগ

Share the post
মোঃ মাহবুবুর রহমান সোহেল,কালিয়াকৈর গাজীপুর: কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সড়ক, অথচ উদ্বোধনের আগেই ভয়াবহ ধস—এ যেন উন্নয়নের নামে এক নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই সড়কের বুক চিরে সৃষ্টি হয়েছে বিশাল ফাটল, দেবে গেছে ১০ থেকে ১৫ ফুট পর্যন্ত অংশ। ঘটনাটি ঘিরে পুরো এলাকায় নেমে এসেছে আতঙ্ক, ক্ষোভ ও হতাশার ছায়া।
রবিবার সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন–এর কাশিমপুর ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ধনঞ্জয়খালী এলাকায় তুরাগ নদী–এর পশ্চিম তীরে নির্মাণাধীন সড়কের একটি বড় অংশ হঠাৎ করেই ধসে পড়েছে। একসময় যেখান দিয়ে চলাচলের স্বপ্ন দেখছিলেন এলাকাবাসী, এখন সেখানে সৃষ্টি হয়েছে গভীর গর্ত—যেন উন্নয়ন প্রকল্পের নীরব প্রতিবাদ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্বাচনের আগে দ্রুত কাজ শেষ করার তাড়নায় নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার ও নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম করা হয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঢালাইয়ের কাজ শেষ হওয়ার মাত্র তিন দিনের মাথায় সড়কের শরীরে ফাটল দেখা দেয়। এরপর ধীরে ধীরে তা বড় আকার ধারণ করে এবং এক পর্যায়ে কয়েক ফুট দেবে গিয়ে পুরো এলাকাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে।
এলাকাবাসীর দাবি, নির্ধারিত মান ও পুরুত্ব বজায় না রেখে তড়িঘড়ি করে ঢালাই করা হয়েছে। নদীর পাড়সংলগ্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রয়োজনীয় মাটি ভরাট, সংরক্ষণ ব্যবস্থা কিংবা স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও সড়ক ধসে পড়া তাদের কাছে চরম অব্যবস্থাপনার প্রমাণ।
সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, ধনঞ্জয়খালী এলাকায় সড়ক নির্মাণের কাজ বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় ইউসিসিএল নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। কাশিমপুর এলাকায় বিটুমিনাস কার্পেটিংয়ের মাধ্যমে সড়ক উন্নয়নকাজ দুটি প্যাকেজের আওতায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
প্যাকেজ নম্বর ১২–এর আওতায় ১ হাজার ১৫০ মিটার সড়ক নির্মাণে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ১০ কোটি ৮০ লাখ টাকা, যা বাড়িয়ে কার্যাদেশ দেওয়া হয় ১১ কোটি ৬৪ লাখ ৪১ হাজার ৫৭১ টাকায়। অন্যদিকে প্যাকেজ নম্বর ৫–এর আওতায় ১২ হাজার ৪৬ মিটার সড়ক নির্মাণে প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ১৩ কোটি ১৯ লাখ ২১ হাজার টাকা, যা বৃদ্ধি পেয়ে ১৪ কোটি ২৮ লাখ ১১ হাজার ৪৫৯ টাকায় উন্নীত হয়। প্রকল্পে ডব্লিউবিএম কার্পেটিং, ফুটপাত, রেলিং ও গার্ডওয়াল নির্মাণের কথাও রয়েছে।
তবে এত বিপুল ব্যয়ের পরও উদ্বোধনের আগেই সড়ক ধসে পড়ার ঘটনায় জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর প্রশ্ন—জনগণের কষ্টার্জিত অর্থে নির্মিত উন্নয়ন প্রকল্প যদি এভাবে ধসে পড়ে, তবে দায় নেবে কে?
এ বিষয়ে কাশিমপুর জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী শামসুর রহমান বলেন, নদীর পাড়ে রাস্তা হওয়ায় প্রাকৃতিক কারণে মাটি সরে যেতে পারে। তবে পরিকল্পনায় কোনো ত্রুটি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর বিস্তারিত জানানো হবে।
প্রকল্প পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এ কে এম হারুনুর রশীদ জানান, ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং সরেজমিনে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে উদ্বোধনের আগেই সড়ক ধসে পড়ার ঘটনায় সাধারণ মানুষের মনে গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে—উচ্চ ব্যয়ের উন্নয়ন প্রকল্পের মান নিয়ন্ত্রণ ও তদারকিতে কোথায় ছিল দায়িত্বশীলদের নজরদারি? দ্রুত তদন্ত, স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং দায়ীদের জবাবদিহির মাধ্যমে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার জোর দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Releated

ধামরাইয়ে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটে বসতঘরে আগুন, ক্ষতি ২ লাখ টাকা

Share the post

Share the postমো: রিপন হোসেন,ধামরাই (ঢাকা) প্রতিনিধি : ঢাকার ধামরাইয়ে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে একটি বসতঘরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রায় দুই লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হলেও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। ফায়ার সার্ভিসের তৎপরতায় প্রায় চার লাখ টাকার মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে। বুধবার (২২ জুলাই) দুপুর ১২টা ৭ মিনিটে উপজেলার কুল্লা ইউনিয়নের পাল্লি এলাকায় এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা […]

মাগুরার শ্রীপুরে সাচিলাপুর বাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, ৩০ লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি

Share the post

Share the postজিল্লুর রহমান সাগর,মাগুরা প্রতিনিধি:মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী সাচিলাপুর বাজারে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে বাজারের একটি বড় ইলেকট্রনিক্স ও স্যানিটারি দোকান সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। প্রাথমিকভাবে এতে প্রায় ৩০ লক্ষাধিক টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে। গতকাল বুধবার (২২ জুলাই) রাত ১২টা ১০ মিনিটের দিকে সাচিলাপুর বাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মো: […]