ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক: ঘোড়াঘাট থানার প্রশাসনিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

Share the post
 শাহারুল ইসলাম,ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর) প্রতিনিধিঃ ঐতিহাসিক নদী করতোয়ার তীরে অবস্থিত দিনাজপুর জেলার ঘোড়াঘাট উপজেলা। কেবল ভৌগোলিক অবস্থান নয়, প্রশাসনিক ও ঐতিহাসিকভাবেও এই অঞ্চলটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি সমৃদ্ধ প্রশাসনিক কেন্দ্র থেকে আজকের উপজেলা হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ এক ইতিহাস।
১. থানা ও উপজেলা প্রতিষ্ঠার ইতিহাস
ঘোড়াঘাট থানার প্রশাসনিক যাত্রার সূচনা ব্রিটিশ শাসন আমলে। শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা ও প্রশাসনিক তদারকির লক্ষ্যে ১৮৯৫ সালে (বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে ১৭৯৩ সালের উল্লেখও পাওয়া যায়) আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোড়াঘাট থানা প্রতিষ্ঠিত হয়। সময়ের পরিক্রমায় এবং প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের অংশ হিসেবে ১৯৮৪ সালে এই থানাকে পূর্ণাঙ্গ উপজেলা হিসেবে উন্নীত করা হয়। বর্তমানে ঘোড়াঘাট উপজেলার প্রশাসনিক কার্যক্রম ১টি পৌরসভা ও ৪টি ইউনিয়ন (বুলাকীপুর, পালশা, সিংড়া ও ঘোড়াঘাট) নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে।
২. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: ‘সরকার-ই-ঘোড়াঘাট’
থানা হিসেবে মর্যাদা পাওয়ার বহু আগে থেকেই ঘোড়াঘাট ছিল অত্র অঞ্চলের প্রশাসনিক ও সামরিক কেন্দ্রবিন্দু।
মুসলিম শাসন আমল: ১২০৬ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজির তিব্বত অভিযানের সময় থেকে এই অঞ্চলে মুসলিম শাসনের ভিত্তি স্থাপিত হয়। সুলতানি আমলে অপরাধ দমন ও সীমান্ত পাহারার জন্য এখানে গড়ে তোলা হয়েছিল শক্তিশালী সামরিক ফাঁড়ি।
মোগল আমলের গৌরব: মোগল সম্রাট আকবরের শাসনামলে রাজস্ব ও প্রশাসনিক সুবিধার জন্য পুরো বাংলাকে ১৯টি ‘সরকার’-এ বিভক্ত করা হয়েছিল। তার মধ্যে অন্যতম ছিল ‘সরকার-ই-ঘোড়াঘাট’। তৎকালীন রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া এবং মালদহের একটি বিশাল অংশ এই সরকার-ই-ঘোড়াঘাটের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল।
৩. প্রশাসনিক রূপান্তর: জেলা থেকে থানায়
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৭৮৬ সালে ব্রিটিশরা দিনাজপুরে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সময় ঘোড়াঘাটকে একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা বা প্রশাসনিক অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করেছিল। তবে ১৭৮৭ সালে লর্ড কর্নওয়ালিসের প্রশাসনিক সংস্কারের ফলে সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হয়। এই পরিবর্তনের ফলে ঘোড়াঘাট তার জেলার মর্যাদা হারায় এবং বৃহত্তর দিনাজপুর জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ থানায় পরিণত হয়।
উপসংহার
প্রাচীন সেই “একান্ন পট্টি বায়ান্ন গলি”র প্রশাসনিক জাঁকজমক বা গৌরবময় অধ্যায় আজ হয়তো বিলুপ্তপ্রায়, কিন্তু ঐতিহ্যের ধারক ঘোড়াঘাট আজও অত্র অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে তার দায়িত্ব পালন করে আসছে। করতোয়ার কুলঘেঁষা এই জনপদ তার নিজস্ব মহিমায় আজও উজ্জ্বল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Releated

পাবিপ্রবিতে র‍্যাগিংয়ের অভিযোগ, গুরুতর অবস্থায় শিক্ষার্থী মেডিকেলে প্রেরণ

Share the post

Share the postপাবিপ্রবি প্রতিনিধি:পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পাবিপ্রবি) ফার্মেসি বিভাগের ২০২৪–২৫ শিক্ষাবর্ষের (১৭ ব্যাচ) কয়েকজন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের (১৮ ব্যাচ) নবীন শিক্ষার্থীদের র‍্যাগিংয়ের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী নবীন শিক্ষার্থীর নাম মুশফিকুর রহমান তুহিন। অভিযুক্ত সিনিয়র শিক্ষার্থীরা হলেন ফার্মেসি বিভাগের সোহানুর, সাকিব, জাহিদ, তানিম, ইউনুস, মুশফিক ও সাইদুরসহ আরও কয়েকজন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মঙ্গলবার […]

ঘোড়াঘাটে করতোয়ার ভাঙনের মুখে আশ্রয়ণ প্রকল্প ও শতাধিক বসতবাড়ি, আতঙ্কে দিন কাটছে বাসিন্দাদের।

Share the post

Share the postশাহারুল ইসলাম, ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর) প্রতিনিধি: দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে করতোয়া নদীর অব্যাহত ভাঙনে চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে একটি আশ্রয়ণ প্রকল্পসহ শতাধিক বসতবাড়ি। নদীর তীব্র ভাঙনে যেকোনো মুহূর্তে ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় দিন কাটছে তীরবর্তী মানুষের। ভাঙন আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন অসহায় পরিবারগুলো। উপজেলার বুলাকিপুর ইউনিয়নের কুলানন্দনপুর নাপিতপাড়া এলাকায় সরেজমিন গিয়ে এমন ভয়াবহ চিত্র দেখা […]