নেত্রকোনায় খাস জমিতে সেনা সদস্যের ভবন: বন্দোবস্ত বাতিল হলেও ঝুলছে উচ্ছেদ অভিযান

Share the post
সোহেল খান দূর্জয়, নেত্রকোনা : নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলায় প্রকৃত ভূমিহীন ও কৃষকদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি খাস জমি মিথ্যা তথ্য দিয়ে দখল করার অভিযোগ উঠেছে অবসরপ্রাপ্ত এক সেনা সদস্যের বিরুদ্ধে। শুধু দখলই নয়, সরকারি বিধান লঙ্ঘন করে খাস জমিতে তিনি নির্মাণ করেছেন দ্বিতল আলিশান ভবন। এমনকি খাস জমির একটি অংশ স্কুল ও কলেজের নামে অন্যের কাছে বিক্রি করে দেওয়ারও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। প্রশাসন তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পেয়ে জমির বন্দোবস্ত বাতিল করলেও, এক বছর হলেও রহস্যজনক কারণে এখনো উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়নি। বারহাট্টা উপজেলার আসমা ইউনিয়নের গুমুরিয়া মৌজায় এ ঘটনা ঘটে। সরেজমিনে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গুমুরিয়া গ্রামের বাসিন্দারা এমন অনিয়মের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। গুমুরিয়া গ্রামের বাসিন্দারা আরও জানান, ‍“বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট আব্দুল মান্নান (স্বপন) তার ক্ষমতার দাপট ও ভয়ভীতি দেখিয়ে খাস জমি দখল করেছেন। ‍সরকারি খাস জমিতে পাকা ভবন করার কোনো নিয়ম নেই। তিনি শুধু দোতলা ভবনই করেননি,ভবন সংলগ্ন খাস জমি স্কুল ও কলেজের নামে বিক্রিও করে দিয়েছেন।”
এদিকে গুমুরিয়া গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দা শেখ মো. সিরাজুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “মান্নানের সবটাই খাস জমি এবং ক্ষমতা দেখিয়ে দ্বিতল ভবন করেছেন। গ্রামবাসীদের এলোমেলো কথা বলে ভয়ভীতি দেখিয়ে, সেনাবাহিনীর লোক হয়ে স্বপন বেআইনি কাজ করেছেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি ভূমিহীন নন। পাবলিক স্কুল ও কলেজের কাছে যে জমি দিয়েছে, সেখানে অল্প কিছু নিজস্ব জায়গা থাকলেও পুরোটাই খাস এবং ওই জায়গাও স্কুল-কলেজের কাছে বিক্রিও করেছেন।”আরেক স্থানীয় বাসিন্দা মো. মাসুম মিয়া জানান, “সেনা সদস্য তার বাড়ির উত্তর পাশের খাস জায়গাটা দখল করেছেন। নদীর পাড়ের খাস জায়গায় তারাই দলবল নিয়ে দখল করেছেন, কারণ তাদের বাড়ি কাছে। সেখানে স্কুল করেছেন। স্কুলের জায়গাটা বিক্রি করেছেন কি-না তা সঠিক জানি না, তবে জায়গাটা খাস।”স্থানীয় বাসিন্দা সুমন মিয়া, চান মিয়া ও সিদ্দিক মিয়ারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “প্রকৃত ভূমিহীনরা আজ জায়গা পাচ্ছে না, অথচ ক্ষমতাশালীরা খাস জমি দখল করে রাজত্ব করছে। আমরা চাই সরকার খাস জমি উদ্ধার করে প্রকৃত ভূমিহীনদের মাঝে বুঝিয়ে দিক।”তাদের সাথে কথা বলে আরও জানা যায়, ২০২৩ সালের নভেম্বরে আসমা ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য মো. আশরাফুল আলম রিপন বারহাট্টার উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। সেই অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে, অভিযুক্ত সেনা সদস্য আব্দুল মান্নানের (রতন) মা মৃত হাজেরা খাতুন স্বাস্থ্য পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরে সরকারি চাকরি করেছেন ও বাবা মৃত ইব্রাহিম আহম্মদ সহকারী ভূমি কর্মকর্তা (নায়েব) ছিলেন। আর্থিকভাবে সচ্ছল ও অকৃষক হওয়া সত্ত্বেও, সম্পূর্ণ মিথ্যা তথ্য দিয়ে ভূমিহীন সেজে এক নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত ১.০৫ একর কৃষিজমি বন্দোবস্ত (কবুলিয়ত) নেন আব্দুল মান্নান গং। এরপর শর্ত ভঙ্গ করে সেখানে দ্বিতল ভবন নির্মাণ করেন এবং জমির কিছু অংশ স্কুল ও কলেজের নামে বিক্রি করে দেন।
অন্যদিকে অভিযোগকারী মো. আশরাফুল আলম রিপনের সাথে যোগাযোগ করা হলে অভিযোগ দেওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, অভিযোগটি কি অবস্থায় আছে খোঁজ নেওয়া হয়নি। তবে তিনি সরে এসেছেন বলে জানান। অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য আব্দুল মান্নানের সাথে কথা বলতে গেলে তিনি প্রতিবেদকের প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি এবং বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তিকর ও পরস্পরবিরোধী মন্তব্য করেন। প্রথমে বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন বলেই তিনি কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। পরে তিনি দাবি করেন, জেলা প্রশাসক (ডিসি) তাকে ভবন নির্মাণের অনুমতি দিয়েছেন এবং তিনি কোর্টে কাগজপত্র জমা দিয়েছেন। আদালত ও অনুমোদনের বৈধ কাগজপত্র দেখতে চাইলে তিনি প্রতিবেদককে দেখাতে ব্যর্থ হন এবং বারবার কোর্টে গিয়ে খোঁজ নেওয়ার কথা বলেন। এদিকে, অভিযোগ প্রাপ্তির পর প্রশাসন তদন্ত করে আনীত অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে। বারহাট্টা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. সাজেদুল ইসলাম জানান, তদন্তে অবৈধ দখলের সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে। সেনা সদস্যের বন্দোবস্ত বাতিল এবং উচ্ছেদ নথি সৃজন করা হয়েছে। এখন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের মাধ্যমে উচ্ছেদ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। তদন্তে প্রমাণ থাকার বছর পার হলেও কেন উচ্ছেদ হয়নি- এমন প্রশ্নের জবাবে নেত্রকোনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সুখময় সরকার বলেন, “এক নম্বর খতিয়ানের জমিতে অবৈধ স্থাপনা করায় বিধি মোতাবেক সেনা সদস্যের কবুলিয়ত বাতিল করা হয়েছে এবং তাকে উচ্ছেদের নোটিশও প্রদান করা হয়েছে।” বিলম্বের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি আরও বলেন, “যেকোনো অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নির্দিষ্ট কিছু আইনি প্রক্রিয়া ও ধাপ রয়েছে। অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত করা, নোটিশ প্রদান এবং অন্যান্য আইনি ধাপ সম্পন্ন করতেই সময় লাগছে। তবে বিষয়টি আমাদের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আমরা আশাবাদী, অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে আইনানুগভাবে অবৈধ এই স্থাপনা উচ্ছেদ করে সরকারি জমি উদ্ধার করা হবে।”প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিলেও, চোখের সামনে সরকারি খাস জমিতে প্রভাবশালীর এমন আলিশান ভবন দাঁড়িয়ে থাকায় আইনের শাসন নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা। তারা দ্রুত অবৈধ এই স্থাপনা উচ্ছেদ করে প্রকৃত ভূমিহীনদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Releated

পাবিপ্রবিতে র‍্যাগিংয়ের অভিযোগ, গুরুতর অবস্থায় শিক্ষার্থী মেডিকেলে প্রেরণ

Share the post

Share the postপাবিপ্রবি প্রতিনিধি:পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পাবিপ্রবি) ফার্মেসি বিভাগের ২০২৪–২৫ শিক্ষাবর্ষের (১৭ ব্যাচ) কয়েকজন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের (১৮ ব্যাচ) নবীন শিক্ষার্থীদের র‍্যাগিংয়ের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী নবীন শিক্ষার্থীর নাম মুশফিকুর রহমান তুহিন। অভিযুক্ত সিনিয়র শিক্ষার্থীরা হলেন ফার্মেসি বিভাগের সোহানুর, সাকিব, জাহিদ, তানিম, ইউনুস, মুশফিক ও সাইদুরসহ আরও কয়েকজন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মঙ্গলবার […]

ঘোড়াঘাটে করতোয়ার ভাঙনের মুখে আশ্রয়ণ প্রকল্প ও শতাধিক বসতবাড়ি, আতঙ্কে দিন কাটছে বাসিন্দাদের।

Share the post

Share the postশাহারুল ইসলাম, ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর) প্রতিনিধি: দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে করতোয়া নদীর অব্যাহত ভাঙনে চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে একটি আশ্রয়ণ প্রকল্পসহ শতাধিক বসতবাড়ি। নদীর তীব্র ভাঙনে যেকোনো মুহূর্তে ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় দিন কাটছে তীরবর্তী মানুষের। ভাঙন আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন অসহায় পরিবারগুলো। উপজেলার বুলাকিপুর ইউনিয়নের কুলানন্দনপুর নাপিতপাড়া এলাকায় সরেজমিন গিয়ে এমন ভয়াবহ চিত্র দেখা […]