তরুণ-নারী ও প্রান্তিক ভোটেই বড় ব্যবধান, নেত্রকোনা – ১ আসনে ৩১ দফা বাস্তবায়নে নতুন বার্তা

Share the post
তোবারক হোসেন খোকন,দুর্গাপুর (নেত্রকোণা) প্রতিনিধি:ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নেত্রকোনা-১ (দুর্গাপুর-কলমাকান্দা) আসনে বেসরকারি ফলাফলে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ও দলের কেন্দ্রীয় কমিটির আইনবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। তবে এই জয় কেবল সংখ্যার ব্যবধানেই সীমাবদ্ধ নয়; ভোটের সামাজিক বিন্যাস, অংশগ্রহণের ধরন এবং নির্বাচনী কৌশল বিশ্লেষণ করলে একটি বিস্তৃত রাজনৈতিক বার্তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী, কায়সার কামাল পেয়েছেন ১ লাখ ৫৮ হাজার ৩৪৩ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের গোলাম রব্বানী পেয়েছেন ৮৭ হাজার ৪৮৮ ভোট। ব্যবধান ৭০ হাজার ৮৫৫। মোট ভোটার ছিলেন ৪ লাখ ৫৬ হাজার ১৮২ জন। ১২৫টি কেন্দ্র ও একটি পোস্টাল ভোটকেন্দ্রে প্রদত্ত ভোট ২ লাখ ৬০ হাজার ৫৯১টি (বাতিল ৬ হাজার ৭৫৩)। ভোটের হার প্রায় ৫৭ দশমিক ১২ শতাংশ। সংখ্যার হিসেবে এটি বড় জয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই ব্যবধান গড়ে উঠল কীভাবে?

ভোটের দিন সকাল থেকেই বিভিন্ন কেন্দ্রে নারী ভোটারদের দীর্ঘ সারি ছিল লক্ষণীয়। প্রথমবারের ভোটার ও তরুণসহ নারীদের উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্য। স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, এই দুই শ্রেণির ভোটারই বড় ব্যবধান তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। নির্বাচনের আগে উঠান বৈঠক, নারী সমাবেশ, শিক্ষার্থী ও তরুণদের সঙ্গে মতবিনিময়-এসব ছিল প্রচারণার কৌশলগত অংশ। কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক ১নং সহ:সভাপতি ও নির্বাচন প্রধান এজেন্ট মুহাম্মদ এজমল হোসেন পাইলটের মাঠপর্যায়ের সমন্বয় তরুণ ভোটারদের সক্রিয় রাখতে ভূমিকা রাখে বলে দলীয় সূত্রের দাবি।

এ ছাড়া সংখ্যালঘু ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ধারাবাহিক সংলাপ, মানবিক সহায়তা, চিকিৎসা কার্যক্রম এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বক্তব্য স্থানীয়ভাবে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। গারো, হাজংসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর এলাকায় লক্ষ্যভিত্তিক যোগাযোগ, সাংস্কৃতিক কর্মীদের যোগাযোগ, শিক্ষক ও সুশীল শ্রেনীর যোগাযোগ নির্বাচনী এই ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। প্রকাশ্যে খুব বেশি উচ্চসিত না হলেও এই শ্রেণির ভোটাররাই ছিলেন ‘নীরব ভোটের বড় একটা ফ্যাক্টর’।

প্রচারণায় বড় সমাবেশের পাশাপাশি ছোট ছোট উঠান বৈঠককে গুরুত্ব দেওয়া হয়। পরিবারভিত্তিক যোগাযোগ, সামাজিক ইস্যু এবং ব্যক্তিগতভাবে বাড়ি বাড়ি গিয়ে যোগাযোগ, পরিচিত ব্যাক্তিদের যোগাযোগ এবং ব্যক্তিগত উপস্থিতি, মিডিয়া কাভারেজ এই কৌশল ভোটারদের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরি করেছে বলেও স্থানীয়রা জানান।

শিক্ষা সহায়তা, চিকিৎসা সহযোগিতা এবং প্রান্তিক পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর মতো উদ্যোগ নির্বাচনী সময়ে আলোচনায় আসে। যদিও এগুলোর সরাসরি ভোট-প্রভাবের পরিসংখ্যান নেই, তবু ভোটারদের মনস্তত্ত্বে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে- এমন ধারণা রাজনৈতিক মহলে বিরাজ করছে।

ফলাফল ঘোষণার পর কায়সার কামাল ‘৩১ দফা’র আলোকে নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। পাহাড়-সমতল, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমঅধিকার নিশ্চিত করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। সেইসাথে দলীয় নেতাকর্মীদের কোন প্রকার অনিয়ম মেনে নেয়া হবেনা এবং তাদের অপরাধ প্রমান হলে দল থেকে বহিস্কারের পাশাপাশি আইনের আওতায় আনা হবে বলেও প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

তবে নির্বাচনে দেয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। স্থানীয়দের প্রত্যাশা-নির্বাচনের আগে যে সরাসরি যোগাযোগ, মানবিক উপস্থিতি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বার্তা ছিল, তা যেন বিজয়ের পরও অব্যাহত থাকে। বিশেষ করে তরুণদের কর্মসংস্থান, নারী নিরাপত্তা ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন এখন অগ্রাধিকার পাওয়ার দাবি উঠছে।

নেত্রকোনা-১ আসনের ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে- নির্বাচনে এখন আর শুধু প্রচলিত ভোটব্যাংক নয়; তরুণ, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভোটও নির্ধারক হয়ে উঠে। এবারের বড় ব্যবধান সেই সামাজিক পরিবর্তনের প্রতিফলন কিনা-তা সময়ই তা বলবে।

এখন নজর থাকবে-এই বিস্তৃত সামাজিক সমর্থনকে কতটা টেকসই উন্নয়ন, অবকাঠামোগত অগ্রগতি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিতে রূপ দিতে পারেন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য। সংখ্যার জয় থেকে কার্যকর পরিবর্তনের পথে যাত্রাই হবে তার নেতৃত্বের আসল পরীক্ষা। প্রতিশ্রুতি দেয়া কাজ গুলো যদি বাস্তবায়ন করতে পারেন তাহলে আগামীতেও তিনি এমপি নির্বাচিত হবেন বলে মনে করছেন, সাংস্কৃতিককর্মী, সংখ্যালঘু, সাধারণ এবং নতুন প্রজন্মের ভোটারগণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Releated

ধামরাইয়ে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটে বসতঘরে আগুন, ক্ষতি ২ লাখ টাকা

Share the post

Share the postমো: রিপন হোসেন,ধামরাই (ঢাকা) প্রতিনিধি : ঢাকার ধামরাইয়ে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে একটি বসতঘরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রায় দুই লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হলেও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। ফায়ার সার্ভিসের তৎপরতায় প্রায় চার লাখ টাকার মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে। বুধবার (২২ জুলাই) দুপুর ১২টা ৭ মিনিটে উপজেলার কুল্লা ইউনিয়নের পাল্লি এলাকায় এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা […]

মাগুরার শ্রীপুরে সাচিলাপুর বাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, ৩০ লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি

Share the post

Share the postজিল্লুর রহমান সাগর,মাগুরা প্রতিনিধি:মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী সাচিলাপুর বাজারে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে বাজারের একটি বড় ইলেকট্রনিক্স ও স্যানিটারি দোকান সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। প্রাথমিকভাবে এতে প্রায় ৩০ লক্ষাধিক টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে। গতকাল বুধবার (২২ জুলাই) রাত ১২টা ১০ মিনিটের দিকে সাচিলাপুর বাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মো: […]