একটি গ্রামে টানা ২০ দিন ‘রহস্যজনক’ আগুন!

Share the post

ঠাকুরগাঁওয়ে একটি গ্রামে ২০ দিনেরও বেশি সময় ধরে ঘটছে রহস্যজনক অগ্নিকাণ্ড। আগুনে একে একে নিঃস্ব হয়েছে ২০টি পরিবার। আগুন আতঙ্কে অনেকেই সন্তানদের নিয়ে ছেড়েছেন গ্রাম। প্রতিদিনই ঘটা এ অগ্নিকাণ্ডে উৎস ও সূত্রপাতও অজানা গ্রামবাসীর কাছে।এ ঘটনায় ‘তান্ত্রিকরা’ বলছেন ‘কালোজাদুর’ বলেই ঘটছে এমন অগ্নিকাণ্ড। তবে তার কোনো সমাধান করতে পারেননি তারা। অন্যদিকে ফায়ার সার্ভিস ও প্রশাসন বলছে, অসতর্কতার কারণেই ঘটতে পারে এমন দুর্ঘটনা। নাশকতার ষড়যন্ত্রের বিষয়টি মাথায় রেখে তদন্তও করছেন তারা।

ঘটনাটি ঘটেছে জেলার বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার চাড়োল ইউনিনের সাবাজপুর গ্রামে।আগুনে পুড়ে মারা যাওয়ার ভয়ে দুই সন্তানকে বাবার বাড়িতে রেখে এসেছেন আমেনা বেগম। দিন-রাত এক করে বাড়ির জিনিসপত্র পাহারা দিচ্ছেন তিনি। সেই সঙ্গে আশঙ্কায় রয়েছেন যে কোনো সময় ঘরবাড়িতে আগুন লেগে সব পুড়ে ছাই হয়ে যেতে পারে।

আমেনা বেগমের মতেরা আগুন আতঙ্কে দিন পার করছেন নূর আলম, মোতালেব, মকসেদ আলীসহ সাবাজপুর গ্রামের ২০ পরিবারের প্রায় শতাধিক লোকজন।

ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি, অলৌকিকভাবে প্রতিদিন ৩-৪ বার আগুন ধরছে বাড়ির বিভিন্ন স্থানে। কখনো রান্নাঘরে, কখনো বা কাপড়ের ট্রাঙ্কের ভেতর, কখনও ঘরের চালাতে। গত ২০ দিনে প্রায় শতাধিকবার আগুন লেগেছে ২০ পরিবারের বাড়িগুলোতে। আগুন নেভানোর জন্য ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি বৈদ্যুতিক পাম্প স্থাপন করেছেন গ্রামের লোকজন।

সর্বশেষ শুক্রবার (২৩ এপ্রিল) সকাল থেকে তিনবার আগুন লেগেছিল ওই গ্রামে। ভোর ও সকালে ঢাকনা দিয়ে রাখা প্লাস্টিকের ড্রামের ভিতর দুবার, দুপুরে গোয়ালে একবার।

গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গেল মাসের ২৯ তারিখে শবে বরাতের রাতে প্রথম আগুনের সূত্রপাত হয়। ওইদিন আগুন নিয়ন্ত্রণে আনলেও পরদিন ৩০ মার্চ আগুনে ৩টি পরিবারের ঘরবাড়িসহ আসবাবপত্র পুড়ে যায়।

ভুক্তভোগী মসসেদ আলী বলেন, আমরা এখন বিশ্বাস করে নিয়েছি এটা অলৌকিক আগুন। ঢাকনা দেওয়া গামলার ভিতর আগুন লেগে ভিতরে পুড়ছে। কোরআন শরীফের ওপর আগুন লেগে ঢাকনা দেওয়া কাপড় পুড়ে গেছে। গত ২০ দিন ধরে আগুন লেগেই চলছে। বন্ধ হচ্ছে না।

মোতালেব হোসেন জানান, গ্রামে বেশ কয়েকজন তান্ত্রিক নিয়ে এসেছিলাম। তান্ত্রিকদের মতে পরিবারগুলোর ওপর কালাজাদু করেছে কেউ। এগুলো দূর করতে হবে। তবে তাদের মধ্যে অনেকেই চেষ্টা করে আগুন বন্ধ করে পারেনি। আমরা আগুন নেভানোর জন্য বিভিন্ন স্থানে ৫টি পাম্প বসিয়েছি।

আমেনা বেগম বলেন, ২০টি পরিবার তাদের সন্তানদের এখন আত্মীয়দের বাড়িতে রেখে এসেছে। মাঠের কাজে যেতে পারছি না। অনেকেই মাঠে ও বাইরে কাজ করতে গেলেও আগুন লাগার খবরে ছুটে আসতে হচ্ছে বাড়িতে। চরম আতঙ্কে দিন কাটছে পরিবারগুলোর।

গ্রামবাসীর দাবি, উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় ফায়ার সার্ভিসের সহযোগিতায় আগুনের সূত্রপাত খুঁজে বের করে গ্রামের পূর্বের অবস্থা ফেরানোর। উপজেলা ফায়ার স্টেশনের কর্মীরা জানান, অসতর্কতার কারণে আগুন লাগছে। আমরা ওই পরিবারগুলোকে ১ মাস মনিটরিং করতে পরামর্শ দিয়েছি। সঠিকভাবে মনিটরিং করলে আগুনের সূত্রপাত খুঁজে পাবে। অলৌকিক কোনো ঘটনা আমরা বিশ্বাস করি না।

বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) যোবায়ের হোসেন জানান, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর উপজেলা প্রশাসন থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে শুকনো খাবার, কম্বল ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় চেয়ারম্যানকে বিষয়টি অবহিত করা হচ্ছে পরিবারগুলোর সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখার জন্য।

ইউএনও আরও বলেন, পরিবারগুলো অলৌকিক আগুন দাবি করলেও বিষয়টি আমরা ভিন্ন ভাবে দেখছি। ধারণা করছি একটি চক্র পরিবারগুলোর মধ্যে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টির ষড়যন্ত্র করছে। জড়িতদের সন্ধান পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উপজেলা চেয়ারম্যান আলী আসলাম জুয়েল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তিনি জানান, পরিবারগুলোকে আর্থিক সহযোগিতা করা হয়েছে। পাশাপাশি পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Releated

পাবিপ্রবিতে র‍্যাগিংয়ের অভিযোগ, গুরুতর অবস্থায় শিক্ষার্থী মেডিকেলে প্রেরণ

Share the post

Share the postপাবিপ্রবি প্রতিনিধি:পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পাবিপ্রবি) ফার্মেসি বিভাগের ২০২৪–২৫ শিক্ষাবর্ষের (১৭ ব্যাচ) কয়েকজন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের (১৮ ব্যাচ) নবীন শিক্ষার্থীদের র‍্যাগিংয়ের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী নবীন শিক্ষার্থীর নাম মুশফিকুর রহমান তুহিন। অভিযুক্ত সিনিয়র শিক্ষার্থীরা হলেন ফার্মেসি বিভাগের সোহানুর, সাকিব, জাহিদ, তানিম, ইউনুস, মুশফিক ও সাইদুরসহ আরও কয়েকজন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মঙ্গলবার […]

ঘোড়াঘাটে করতোয়ার ভাঙনের মুখে আশ্রয়ণ প্রকল্প ও শতাধিক বসতবাড়ি, আতঙ্কে দিন কাটছে বাসিন্দাদের।

Share the post

Share the postশাহারুল ইসলাম, ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর) প্রতিনিধি: দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে করতোয়া নদীর অব্যাহত ভাঙনে চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে একটি আশ্রয়ণ প্রকল্পসহ শতাধিক বসতবাড়ি। নদীর তীব্র ভাঙনে যেকোনো মুহূর্তে ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় দিন কাটছে তীরবর্তী মানুষের। ভাঙন আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন অসহায় পরিবারগুলো। উপজেলার বুলাকিপুর ইউনিয়নের কুলানন্দনপুর নাপিতপাড়া এলাকায় সরেজমিন গিয়ে এমন ভয়াবহ চিত্র দেখা […]