রানা প্লাজার সেই কালো সকাল: ১৩ বছরেও মেলেনি পূর্ণ ন্যায়বিচার, ক্ষত এখনো তাজা

Share the post

শামীম ব্যাপারী, সাভার-আশুলিয়া প্রতিনিধি : সাভারের রানা প্লাজা ধসের সেই ভয়াবহ দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এখনো এক গভীর ক্ষতের মতো রয়ে গেছে। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকাল বেলা, আটতলা এই বাণিজ্যিক ভবনটি হঠাৎ ধসে পড়ে, মুহূর্তেই পরিণত হয় হাজারো মানুষের মৃত্যু ও আহত হওয়ার এক বিভীষিকাময় ঘটনায়। আজও সেই ঘটনার স্মৃতি ভুলতে পারেননি বেঁচে যাওয়া শ্রমিকরা এবং নিহতদের পরিবার। প্রতিবছর এই দিনে তারা ন্যায়বিচার ও যথাযথ ক্ষতিপূরণের দাবি নিয়ে স্মরণ করে সেই করুণ দিনটি।

 

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকালে ভবনটিতে কাজ শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পরেই হঠাৎ কাঁপুনি অনুভূত হয়। শুরুতে অনেকেই বিষয়টি গুরুত্ব না দিলেও কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুরো ভবনটি ধসে পড়ে।একজন বেঁচে যাওয়া শ্রমিক বলেন,আমরা কাজ করছিলাম, হঠাৎ মনে হলো মাটি কাঁপছে। এরপর আর কিছু মনে নেই। যখন জ্ঞান ফিরলো, তখন চারপাশে শুধু ধুলো আর মানুষের আর্তনাদ।আরেকজন শ্রমিক বলেন,আমি দুই দিন ধ্বংসস্তূপের নিচে ছিলাম। আমার পাশেই আমার সহকর্মীরা মারা যাচ্ছিল। কেউ পানি চাইছিল, কেউ চিৎকার করছিল, কিন্তু আমরা কিছুই করতে পারিনি।

হতাহত ও ক্ষতির পরিমাণ এই দুর্ঘটনায় ১,১০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন এবং দুই হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হন। অনেকেই চিরতরে পঙ্গু হয়ে যান। গার্মেন্টস শ্রমিকদের পাশাপাশি ভবনের দোকানদার, অফিস কর্মচারী এবং অন্যান্য কর্মরত মানুষও এতে প্রাণ হারান।

একজন আহত শ্রমিক দেলোয়ার হোসেন বলেন, আমার দুই পা এখনো ঠিকভাবে কাজ করে না। আগে কাজ করে সংসার চালাতাম, এখন অন্যের সাহায্য ছাড়া চলতে পারি না।নিহত আবুল কালামের পরিবার জানায়, আমাদের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়েছি। আজও আমরা তার ক্ষতিপূরণ পাইনি। শুধু কাগজে-কলমে আশ্বাস পেয়েছি।

ধসের পরপরই শুরু হয় বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উদ্ধার অভিযান। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ এবং আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল একযোগে কাজ করে ধ্বংসস্তূপ থেকে মানুষ উদ্ধারে। টানা কয়েকদিন ধরে চলা এই অভিযানে অনেককে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও বহু মানুষ আর কখনো ফিরে আসেননি।

একজন উদ্ধারকর্মী বলেন,আমরা যখন ভেতরে যেতাম, তখন শুধু কান্নার শব্দ শুনতাম। অনেককে জীবিত বের করতে পারলেও অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল।

ক্ষতিপূরণ ও বিচার প্রক্রিয়া ঘটনার পর আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক সমালোচনা হয়। বিভিন্ন দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান ও ক্রেতা কোম্পানি ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি দেয়। কিছু ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হলেও এখনো অনেক পরিবার অভিযোগ করেন, তারা পূর্ণ ন্যায্যতা পাননি।

ভুক্তভোগী নার্গিস আক্তারের পরিবারের সদস্য বলেন,আমাদের বলা হয়েছিল দ্রুত বিচার হবে, ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। কিন্তু বছর পার হয়ে গেলেও আমরা শুধু প্রতিশ্রুতি শুনছি, বাস্তবতা বদলায়নি।অন্যদিকে শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত না হওয়ায় ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

আজও রানা প্লাজার স্থানে দাঁড়ালে শুধু ধ্বংসস্তূপের স্মৃতি নয়, হাজারো স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার ইতিহাস মনে পড়ে। ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের অনেকেই এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি

একজন প্রতিবন্ধী শ্রমিক জাহানারা বলেন আমি এখন কাজ করতে পারি না। পরিবার চালানো কঠিন হয়ে গেছে। সরকারের কাছ থেকে যদি স্থায়ী সহায়তা পেতাম, তাহলে বাঁচতে পারতামপ্রতিবছর এই দিনে শ্রমিক সংগঠন, মানবাধিকার কর্মী এবং সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচারের দাবি নিয়ে রাস্তায় নামেন। তারা বলেন, শুধুমাত্র স্মরণ নয়, বাস্তব বিচার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।একজন শ্রমিক নেতা বলেনরানা প্লাজা শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি ছিল অবহেলা ও দুর্নীতির ফল। দোষীদের শাস্তি না হলে শ্রমিকদের নিরাপত্তা কখনোই নিশ্চিত হবে না।

ভবিষ্যতের শিক্ষা রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে এক বড় শিক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরবর্তীতে ভবন নিরাপত্তা, শ্রমিক অধিকার এবং কারখানা পরিদর্শনে কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এখনো অনেক ঘাটতি রয়ে গেছে।

একজন শ্রম বিশেষজ্ঞ বলেনশুধু আইন তৈরি করলেই হবে না, তার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। না হলে এ ধরনের ঘটনা আবারও ঘটতে পারে।রানা প্লাজা ধস কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি ছিল হাজারো মানুষের জীবন ও স্বপ্নের করুণ সমাপ্তি। আজও সেই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণের অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছে। প্রতিবছর এই দিনে তারা শুধু স্মরণ করে না, বরং আবারও মনে করিয়ে দেয় মানব জীবনের মূল্য কোনোভাবেই অবহেলা করার নয়।বেঁচে থাকা শ্রমিকদের কণ্ঠে আজও একই দাবি প্রতিধ্বনিত হয়—আমরা শুধু সহানুভূতি নয়, চাই ন্যায়বিচার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Releated

পাবিপ্রবিতে র‍্যাগিংয়ের অভিযোগ, গুরুতর অবস্থায় শিক্ষার্থী মেডিকেলে প্রেরণ

Share the post

Share the postপাবিপ্রবি প্রতিনিধি:পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পাবিপ্রবি) ফার্মেসি বিভাগের ২০২৪–২৫ শিক্ষাবর্ষের (১৭ ব্যাচ) কয়েকজন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের (১৮ ব্যাচ) নবীন শিক্ষার্থীদের র‍্যাগিংয়ের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী নবীন শিক্ষার্থীর নাম মুশফিকুর রহমান তুহিন। অভিযুক্ত সিনিয়র শিক্ষার্থীরা হলেন ফার্মেসি বিভাগের সোহানুর, সাকিব, জাহিদ, তানিম, ইউনুস, মুশফিক ও সাইদুরসহ আরও কয়েকজন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মঙ্গলবার […]

ঘোড়াঘাটে করতোয়ার ভাঙনের মুখে আশ্রয়ণ প্রকল্প ও শতাধিক বসতবাড়ি, আতঙ্কে দিন কাটছে বাসিন্দাদের।

Share the post

Share the postশাহারুল ইসলাম, ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর) প্রতিনিধি: দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে করতোয়া নদীর অব্যাহত ভাঙনে চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে একটি আশ্রয়ণ প্রকল্পসহ শতাধিক বসতবাড়ি। নদীর তীব্র ভাঙনে যেকোনো মুহূর্তে ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় দিন কাটছে তীরবর্তী মানুষের। ভাঙন আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন অসহায় পরিবারগুলো। উপজেলার বুলাকিপুর ইউনিয়নের কুলানন্দনপুর নাপিতপাড়া এলাকায় সরেজমিন গিয়ে এমন ভয়াবহ চিত্র দেখা […]