পদ্মপুরাণের স্মৃতিবিজড়িত উজানীর বেহুলার রাজবাড়ী ও দিঘি বিলীন হওয়ার পথে সংরক্ষণের দাবিতে এলাকাবাসী, অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে লোকঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন
আহসান হাবীব সুমন,কচুয়া (চাঁদপুর) প্রতিনিধি :পদ্মপুরাণে বর্ণিত কিংবদন্তির অন্যতম চরিত্র বেহুলার পৈত্রিক নিবাস হিসেবে পরিচিত চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার উজানী গ্রাম (তৎকালীন উজানী নগর) আজও বহন করছে ইতিহাস, লোককথা ও ধর্মীয় বিশ্বাসের নানা স্মৃতি। তবে যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে বেহুলার রাজবাড়ী, দিঘি এবং স্মৃতিচিহ্নগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, উজানী গ্রামের উত্তরাংশে অবস্থিত বেহুলার পৈত্রিক রাজবাড়ীর ধ্বংসাবশেষ এখনও বিদ্যমান। রাজবাড়ীটি বেহুলার পিতার নামানুসারে পরিচিত। এর দক্ষিণে রয়েছে “বেহুলার দিঘি” নামে পরিচিত একটি প্রাচীন দিঘি, যা দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়দের কাছে ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
স্থানীয় প্রবীণদের দাবি, বেহুলার দিঘির উত্তর পাড়ে রাজবাড়ী থেকে প্রায় ৫০ মিটার দক্ষিণে একসময় বেহুলার ছোটবেলার খেলনার সামগ্রী হিসেবে পরিচিত একটি প্রাচীন শিলা পাথর (স্থানীয় ভাষায় “বেহুলার পাটা”) ছিল। আংশিক অবশিষ্ট এই শিলাটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৩২ ইঞ্চি, প্রস্থ ২৬ ইঞ্চি এবং ওজন আনুমানিক ২৫০ কেজি বলে ধারণা করা হয়।
এলাকায় প্রচলিত জনশ্রুতি অনুযায়ী, কয়েক বছর আগে এক ধোপা ওই শিলায় কাপড় ধোয়ার সময় এটি বিকট শব্দে স্থানচ্যুত হয়ে উজানী গ্রামের দুধখাঁর দিঘিতে পড়ে যায়। পরে শিলাটি পানির ওপর ভেসে উঠেছিল বলেও স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, উজানী গ্রামের উত্তরপাড়ায় খন্দকার বাড়ি সংলগ্ন এলাকায় বর্তমানে বেহুলার রাজবাড়ীর কেবল ইটের ধ্বংসস্তূপই অবশিষ্ট রয়েছে। স্থানীয়রা জানান, যুগের পর যুগ ধরে রাজবাড়ীর ধ্বংসাবশেষ একই অবস্থায় রয়েছে। আশ্চর্যের বিষয়, সেখান থেকে কেউ একটি ইটও সরিয়ে নেয়নি।
স্থানীয়দের মধ্যে আরও একটি জনশ্রুতি রয়েছে—এক ব্যক্তি একসময় রাজবাড়ী থেকে একটি ইট নিয়ে গিয়েছিলেন। পরে স্বপ্নে নির্দেশ পেয়ে তিনি সেই ইট আবার ফিরিয়ে দিয়ে যান। এরপর থেকে আর কেউ ওই স্থান থেকে কোনো কিছু নেওয়ার সাহস করেননি বলে এলাকাবাসীর বিশ্বাস।
বর্তমানেও বেহুলার রাজবাড়ী ও বেহুলার দিঘিকে ঘিরে স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা নিয়মিত পূজা-অর্চনা করে আসছেন। তাদের কাছে স্থানটি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব বহন করে।
এলাকার সচেতন নাগরিক ও সাধারণ মানুষের দাবি, পদ্মপুরাণ ও বাংলার লোকঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িত এই স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো প্রত্নতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। তাদের মতে, যথাযথ সংরক্ষণ করা হলে উজানীর বেহুলার রাজবাড়ী ও দিঘি দেশীয় ঐতিহ্য, গবেষণা এবং পর্যটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।ছবি ও ভিডিও কচুয়া বেহুলার রাজবাড়ী ইটের ধ্বংসস্তূপ ও বেহুলার দিঘির একাংশ।

