মোহাম্মদ আবু সালেহ(নারায়ণগঞ্জ সদর ও বন্দর) নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি :নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে তানিয়া আক্তার নামে এক নারীকে হত্যার ঘটনায় তার স্বামী সোহাগ মিয়া জুলহাসকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পারিবারিক অভাব-অনটন ও আর্থিক বিষয় নিয়ে দাম্পত্য কলহের একপর্যায়ে স্ত্রীকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন সোহাগ।
হত্যাকাণ্ডের পর আত্মগোপনে চলে যান তিনি। প্রায় দুই সপ্তাহ পর প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তার অবস্থান শনাক্ত করে পিবিআই। পরে গাইবান্ধা থেকে নারায়ণগঞ্জগামী একটি বাসে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সকালে নারায়ণগঞ্জ পিবিআই কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পিবিআই নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. মোস্তফা কামাল রাশেদ।
গ্রেপ্তার সোহাগ মিয়া জুলহাসের বয়স ৩৩ বছর। তিনি গাইবান্ধা সদর থানার পূর্ব কোমরজানি (ডাক্তার বাড়ি) এলাকার সেকান্দার আলীর ছেলে। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের জালকুড়ি পশ্চিমপাড়া মাতবর বাড়ি এলাকায় ভাড়া বাসায় স্ত্রী তানিয়ার সঙ্গে বসবাস করতেন।
যেভাবে হত্যাকাণ্ড পিবিআইয়ের তদন্ত অনুযায়ী, গত ২৫ জুলাই দিবাগত রাত সাড়ে ১২টা থেকে রাত ১টার মধ্যে সংসারের আর্থিক সংকট নিয়ে তানিয়া ও সোহাগের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়। একপর্যায়ে সোহাগ তানিয়ার গলা চেপে ধরলে শ্বাসরোধে তার মৃত্যু হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
পরদিন সকালে তানিয়ার মরদেহ ঘরে রেখেই তার নাক থেকে স্বর্ণের নাকফুল খুলে নেন সোহাগ। এরপর ঘরে তালা লাগিয়ে চাবি তানিয়ার খালা নাছিমা আক্তারের কাছে দিয়ে সেখান থেকে চলে যান। পরে নিজের মোবাইল ফোন বন্ধ করে আত্মগোপনে চলে যান তিনি।২৬ জুলাই সকালে নাছিমার বাসায় গিয়ে সোহাগ দাবি করেন, তানিয়া গার্মেন্টসে কাজে গেছেন। এমনকি কর্মস্থলের ব্যবস্থাপকের সঙ্গে কথা হয়েছে এবং তাকে ছুটি দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। দুপুরে চাবি নিয়ে তানিয়ার বাসায় যাওয়ার জন্য নাছিমাকে বলেন সোহাগ।কিন্তু তানিয়ার কর্মস্থলে গিয়ে নাছিমা জানতে পারেন, ওই দিন তানিয়া গার্মেন্টসে যাননি। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় তিনি তানিয়ার বাসায় যান। সেখানে দরজায় তালা দেখতে পেয়ে বাড়ির মালিকের ছেলের স্ত্রী শ্রাবন্তীকে সঙ্গে নিয়ে চাবি দিয়ে ঘরে প্রবেশ করেন।
ঘরের ভেতরে মশারির মধ্যে তানিয়াকে পড়ে থাকতে দেখা যায়। ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া না পাওয়ায় নাছিমা কাছে গিয়ে তার নাক-মুখে রক্তের চিহ্ন দেখতে পান। শরীর শক্ত হয়ে যাওয়ার বিষয়টি বুঝতে পেরে তিনি চিৎকার শুরু করেন। পরে স্থানীয়রা এসে পুলিশকে খবর দেন।পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়। এ ঘটনায় তানিয়ার খালা নাছিমা আক্তার বাদী হয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন।প্রেমের সম্পর্ক থেকে বিয়ে তদন্তে পিবিআই জানতে পারে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে তানিয়া ও সোহাগের পরিচয় হয়। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে পরিবারের মতের বাইরে গিয়ে তারা বিয়ে করেন।বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে পারিবারিক বিরোধ চলছিল। সোহাগের স্থায়ী কোনো চাকরি বা আয়ের ব্যবস্থা ছিল না। সংসারের ব্যয় ও আর্থিক সংকটকে কেন্দ্র করে প্রায়ই তাদের মধ্যে ঝগড়া হতো। তানিয়াকে মারধরের ঘটনাও ঘটেছিল বলে তদন্তে তথ্য পেয়েছে পিবিআই।মামলাটি পিবিআইয়ের সিডিউলভুক্ত হওয়ার পর গত ১০ আগস্ট সংস্থাটি নিজ উদ্যোগে তদন্ত শুরু করে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পান এসআই মো. মোস্তাফিজুর রহমান
প্রযুক্তির সহায়তায় গ্রেপ্তার পিবিআই জানায়, হত্যাকাণ্ডের পর মোবাইল ফোন বন্ধ করে আত্মগোপনে চলে যান সোহাগ। প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রথমে ঢাকার খিলগাঁও এলাকায় তার অবস্থানের তথ্য পাওয়া যায়। পরে মেরাদিয়া ও ছোবাহানবাগ এলাকায় তার অবস্থান শনাক্ত করা হয়। সেখানে কয়েক দফা অভিযান চালানো হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।পরবর্তী সময়ে গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের সমন্বয়ে সোহাগের গতিবিধি সম্পর্কে নিশ্চিত হয় পিবিআই। মঙ্গলবার ভোর ৪টা ৫০ মিনিটের দিকে গাইবান্ধা থেকে নারায়ণগঞ্জগামী একটি দূরপাল্লার বাসে অভিযান চালানো হয়। ফতুল্লার সাইনবোর্ড এলাকার চৌরঙ্গী ফিলিং স্টেশনের সামনে বাসটি থামিয়ে সোহাগকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আদালতে স্বীকারোক্তি গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তানিয়া হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন সোহাগ—এমন তথ্য জানিয়েছে পিবিআই। পরে তাকে আদালতে হাজির করা হলে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন তিনি।
পিবিআই নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. মোস্তফা কামাল রাশেদ জানান, প্রযুক্তিগত তথ্য, গোয়েন্দা অনুসন্ধান, সাক্ষ্য ও অন্যান্য প্রমাণ বিশ্লেষণের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করা হয়েছে। এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত ছিল কি না, তা যাচাই করতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

