শফিকুল বারী,সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি :সুনামগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালে অ্যানেস্থেসিয়া বিভাগের তিন চিকিৎসকের দায়িত্ব পালন পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি চাকরির বিধি অনুযায়ী প্রতিদিন কর্মস্থলে উপস্থিত থাকার পরিবর্তে তারা নিজেদের মধ্যে রোস্টার করে হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছেন। বাকি সময়ে কেউ সিলেটে, আবার কেউ সুনামগঞ্জের বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসাসেবা দিয়ে থাকেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, সদর হাসপাতালে কর্মরত অ্যানেস্থেসিয়া বিভাগের চিকিৎসক ডা. শর্বানি, ডা. শুভ্র ও ডা. সুহেল নিজেদের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিন হাসপাতালে উপস্থিত থাকেন। অভিযোগকারীদের দাবি, ডা. শর্বানি সপ্তাহে দুই দিন হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করে বাকি সময় সিলেটের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে কাজ করেন। একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে ডা. সুহেলের বিরুদ্ধেও। অন্যদিকে ডা. শুভ্র সপ্তাহে দুই দিন সদর হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করে অন্যান্য দিন সুনামগঞ্জ শহরের কয়েকটি বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসাসেবা দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. রফিকুল ইসলাম বলেন, সরকারি চাকরিতে প্রতিদিন অফিসে উপস্থিত থাকতে হবে। রোস্টার করে অফিসে না আসার কোনো নিয়ম নেই। যদি এমন ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে সরকারি বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একই বিষয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আহমদ হোসেন প্রথমে বলেন, অপারেশন থিয়েটারে (ওটি) কাজ হচ্ছে। পরে তিনি সাংবাদিককে পাল্টা প্রশ্ন করেন, ডাক্তার নিয়মিত আসছে না, এটা কি আপনার সমস্যা, নাকি ওটিতে কাজ হচ্ছে না, সেটাই আপনার সমস্যা।
জবাবে সরকারি চাকরির বিধি অনুযায়ী চিকিৎসকদের প্রতিদিন অফিস করা বাধ্যতামূলক কি না—এমন প্রশ্ন করা হলে তত্ত্বাবধায়ক বলেন, তারা তিনজন নিজেদের মধ্যে রোস্টার করে ডিউটি করছেন। আগের চেয়ে এখন ওটিতে বেশি কাজ হচ্ছে। তারা নিয়মিত আসছেন কি না, সেটি আমি দেখব। আমি নতুন এসেছি, এখনো এসব বিষয় পুরোপুরি জানি না।
তিনি আরও বলেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী চিকিৎসকদের প্রতিদিন অফিস করতে হবে। যদি কেউ দুই দিন হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করে বাকি চার দিন অন্য কোথাও প্র্যাকটিস করে থাকেন, তাহলে বিষয়টি তদন্ত করে সরকারি বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী সাহরিয়ারের অভিযোগ, সার্জনরা সকালে অপারেশন থিয়েটারে উপস্থিত থাকলেও অ্যানেস্থেসিয়া চিকিৎসকরা অনেক সময় সকাল ১০টা থেকে ১১টার আগে আসেন না। এতে রোগীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় এবং অপারেশন শুরু হতেও বিলম্ব হয়।
আরেক রোগী গোলাম রাব্বি বলেন, সদর হাসপাতালের আউটডোরে অনেক ক্ষেত্রে ডিএমএফ দিয়ে চিকিৎসাসেবা চালানো হচ্ছে। অথচ অনেক চিকিৎসক রোস্টার করে দায়িত্ব পালন করেন। তত্ত্বাবধায়ক চাইলে যারা সপ্তাহের কয়েকদিন হাসপাতালে আসেন না, তাদের দিয়েও আউটডোরে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব। গ্রামের সাধারণ মানুষ চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে আসেন। তারা বুঝতে পারেন না কে এমবিবিএস চিকিৎসক আর কে ডিএমএফ। সাধারণ মানুষের সঙ্গে এ ধরনের বিষয় অন্যায়।
তবে রোগীদের এসব অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে পৃথক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে সিনিয়র কনসালট্যান্ট (অ্যানেস্থেসিয়া) ডা. শর্বানির বক্তব্য জানতে গত কয়েকদিন ধরে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। অন্য দুই চিকিৎসকের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্বাস্থ্য প্রশাসনের সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি চাকরিতে কর্মরত কোনো চিকিৎসক অনুমতি ছাড়া নিয়মিত কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকে অন্যত্র দায়িত্ব পালন করলে তা সরকারি চাকরি বিধিমালার পরিপন্থী হতে পারে। অভিযোগের সত্যতা তদন্তে প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এ ঘটনায় স্থানীয় সচেতন মহল নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা গেলে রোগীরা আরও সময়োপযোগী ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পাবেন।

