এম এম আরিফুল ইসলাম,নাটোর প্রতিনিধি: দেশের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এ বছরের একুশে পদকে ভূষিত হয়েছেন নাটোরের বড়াইগ্রামের কৃতি সন্তান, প্রখ্যাত চারুকলা শিক্ষক, লেখক ও গবেষক অধ্যাপক ড. আব্দুস সাত্তার। বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে তিনি রাষ্ট্রের অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক এই সম্মাননা গ্রহণ করেন।রাষ্ট্রীয় এ সম্মাননা পাওয়ায় নাটোরসহ দেশের শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনে আনন্দ ও গর্বের আবহ সৃষ্টি হয়েছে। শিল্পচর্চা, গবেষণা ও চারুকলা শিক্ষায় দীর্ঘদিনের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেই তাকে এই পদক প্রদান করা হয়।
অধ্যাপক ড. আব্দুস সাত্তার ১৯৪৭ সালে নাটোর জেলার বড়াইগ্রাম উপজেলার চকবড়াই গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই শিল্পকলার প্রতি গভীর আগ্রহ ও প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন তিনি। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে ১৯৭৩ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ওরিয়েন্টাল আর্ট বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তিনি অসংখ্য শিক্ষার্থীকে শিল্পচর্চায় অনুপ্রাণিত করেছেন এবং দেশের চারুকলা শিক্ষার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য তিনি ভারতের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে চিত্রকলা, ছাপচিত্র ও ভাস্কর্যে বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের Georgetown University থেকে ইংরেজি সাহিত্যে উচ্চতর ডিগ্রি এবং নিউইয়র্কের Pratt Institute থেকে ছাপচিত্রে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী কাঠখোদাই শিল্প নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন, যা দেশের শিল্প ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হয়।
দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে শিক্ষকতা করে অসংখ্য গুণী শিল্পী, গবেষক ও শিক্ষক তৈরি করেছেন। অবসর গ্রহণের পরও তিনি অনারারি অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষাদান ও গবেষণায় সক্রিয় রয়েছেন। তার গবেষণা, শিল্পকর্ম ও লেখালেখি দেশ-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে এবং বাংলাদেশের শিল্প ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন একুশে পদক প্রাপ্তির অনুভূতি প্রকাশ করে অধ্যাপক ড. আব্দুস সাত্তার বলেন, “এই সম্মাননা আমার ব্যক্তিগত অর্জন নয়, এটি বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতি ও চারুকলার স্বীকৃতি। আমি আজীবন দেশের শিল্প ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করেছি এবং ভবিষ্যতেও নতুন প্রজন্মকে শিল্পচর্চায় উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা চালিয়ে যাব।”
বড়াইগ্রাম উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি মোঃ অহিদুল হক সরকার বলেন, “ড. আব্দুস সাত্তার আমাদের বড়াইগ্রামের গর্ব। তার এই অর্জন শুধু বড়াইগ্রাম নয়, পুরো নাটোর জেলার জন্য সম্মানের। তার কর্ম ও গবেষণা নতুন প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।”
নাটোর প্রেসক্লাবের সভাপতি মোঃ শহীদুল হক সরকার বলেন, “একুশে পদক প্রাপ্তি একটি বড় অর্জন। নাটোরের একজন গুণী সন্তান দেশের সর্বোচ্চ সম্মান লাভ করায় আমরা অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত। এটি নাটোরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্য একটি বিশেষ অর্জন।”
নাটোরের স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “আমাদের বড়াইগ্রামের সন্তান দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ সম্মাননা পেয়েছেন, এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়। তার এই অর্জন তরুণ প্রজন্মকে শিল্প ও সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী করে তুলবে।”
নাটোর জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন বলেন, “ড. আব্দুস সাত্তার নাটোর জেলার গর্ব। তার এই অর্জন জেলার সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে আরও সমৃদ্ধ করবে এবং তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।”
সংস্কৃতি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, অধ্যাপক ড. আব্দুস সাত্তারের একুশে পদক প্রাপ্তি দেশের চারুকলা অঙ্গনের জন্য একটি গৌরবোজ্জ্বল মাইলফলক। তার এই অর্জনের মাধ্যমে দেশের শিল্প-সংস্কৃতি ও গবেষণাক্ষেত্র আরও সমৃদ্ধ হবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেছেন।

