নেত্রকোনার বারহাট্টায় কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহারে বদলে গেছে কৃষকের ভাগ‍্য

Share the post
সোহেল খান দূর্জয় নেত্রকোনা প্রতিনিধি : কৃষিজমিতে আধুনিক  প্রযুক্তি ব্যবহার, সময়োপযোগী কৃষিনীতি আর কৃষকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে বদলে গেছে বারহাট্টা উপজেলার কৃষির চিত্র।
কৃষিক্ষেত্রে সবজি ও ধান চাষে বারহাট্টায় নীরব বিপ্লব ঘটেছে। সবজির ও ধান উৎপাদন দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে বারহাট্টায়। কৃষকদের আয়ও বেড়েছে।
দেশের উত্তরাঞ্চল নেত্রকোনা জেলার বারহাট্টার কৃষকরা বিবর্তিত জলবায়ুর সাথে সংগ্রাম করে কৃষি বিপ্লবে এখন মাঠে ময়দানে কাজ করছেন।
বৈরী আবহাওয়াকে চ্যালেঞ্জ করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফসল ফলাতে এখন কঠোর পরিশ্রম করছেন বারহাট্টার কৃষকরা।
এ যুদ্ধ গ্রামে গ্রামে মাঠে মাঠে বাড়ির আঙ্গিনায় আঙ্গিনায়। এ সংগ্রাম যেন সর্বত্র।
মাটির মাঝে তুলে আনছে ফসলের খাটি সোনা। গত দুই যুগ আগের কৃষি কাজের সাথে বিস্তার ফারাক এখনকার প্রযুক্তি। যেখানে একদা সবজি ও ধান চাষ ছিল অনুর্ভর জমিতে আকাশকুসুম কল্পনা মাত্র সেখানে সবজি ও ধান চাষ এখন আশীর্বাদ।
বতর্মান বাজারে সবজির ও ধানের মূল্য এখন কম নয়।যেমন সারা বছর গড়ে কোন সবজির দামই ৪০ টাকার নিচে নয়। কৃষক তাই কোমর বেধে কৃষিযজ্ঞে আমুল পরিবর্তন আনছে। তাই উচ্চফলনশীল সবজি ও ধান চাষ উত্তরাঞ্চল নেত্রকোনার বারহাট্টার কৃষকের ভাগ্য ক্রমেই বদলে দিয়েছে এই সবজি ও ধান চাষ বিপ্লব। বারহাট্টা উপজেলার প্রতিটি গ্রামে গ্রামে চাষ হচ্ছে এ উন্নতন মানের সবজি ও ধান চাষ।
উত্তরাঞ্চল নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে কম খরচে অধিক লাভ হওয়ায় কৃষকরা এখন উচ্চফলনশীল জাতের ধান ও শাক-সবজির চাষ করছেন। কৃষকরা দেশীয় বীজ বাদে হাইব্রিড চাষ করে অধিকফলন ফলাচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করর্পোরেশনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কৃষিকাজে সেকালে যন্ত্রপাতির বদলে আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারে আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের।
কেবল জমি চাষই নয়, জমিতে সার দেওয়া, কীটনাশক ছিটানো থেকে শুরু করে সবই আধুনিক যন্ত্রের মাধ্যমে করা যাচ্ছে।
নেত্রকোনা জেলা কৃষি অফিসারের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী বারহাট্টায় আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে মাঠে ঘাটে ধান ও সবজি চাষ অব্যাহত রেখেছেন।
কৃষিবিদ সারোয়ার মোর্শেদ আকন্দ জাস্টিস বলেন, সরকারের যুগোপযোগী পরিকল্পনা, কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার, পরিশ্রমী কৃষক এবং মেধাবী কৃষি বিজ্ঞানী যৌথ প্রয়াসেই এমন সাফল্য এসেছে।
বারহাট্টা কৃষি বিভাগের পরামর্শে বেশ কয়েক একর জমিতে ধান ও বেশ কয়েক হেক্টর জমিতে সবজি চাষ এখন নজর কাড়ার মত। বারহাট্টা উপজেলার কিছু অঞ্চলে যেখানে কোনদিন সবজি চাষের অস্তিত্বই ছিল না সেখানে এখন সবুজের সমরাহ।
বারহাট্টা উপজেলার শালনগর গ্রামের কৃষক রমজান আলী এই প্রতিনিধিকে জানান, বেশ কয়েক বছর ধরে তিনি কৃষি কাজের সাথে আছেন তার পরিশ্রম বৃথা যায়নি তিনি একজন সফল কৃষক
এটি তার প্রধান পেশা।
চলতি বছর তিনি ৫ বিঘা জমিতে সবজি চাষ করে প্রায় ২ লাখ টাকার বেচা কেনা করেছেন তাতে ভালোই আয় হয়েছে তার। প্রতিদিন অনেক সবজি তিনি বাজারজাত করেন। তিনি লাউ, কপি ও শিম চাষ করেন এখন একজন স্বাবলম্বী কৃষক।
জিথন গ্রামের কৃষক করিম (৫২) ছোট বেলা থেকেই কৃষি কাজ করে সংসার চালান তিনি।
এ বছর তিনি বারহাট্টা উপজেলা কৃষি বিভাগের  পরামর্শে ১০০শতক জমিতে ধান লাগিয়েছেন। এতে তার খরচ হয়েছে অনেক কম টাকা।
ইতোমধ্যেই তিনি ধানের পাশাপাশি সবজি চাষ করে ৪০ হাজার টাকার সবজি বিক্রি করেছেন বাজারে।
আলোকদিয়া গ্রামের কৃষক আমিরুল ইসলাম কয়েক বছর ধরে ধানের পাশাপাশি শিম,লাউ, কপি আবাদ করে ভালো দাম পেয়েছেন।
এবার লাউ ও শিম চাষের পাশাপাশি অন্যান্য সবজিও চাষ করেছেন। অল্প সময়ে  ফসল তোলার পাশাপাশি রোগবালাই এবং লোকসানের শঙ্কা কম বলে আমিরুলের মতো অনেকেই এখন ধানের পাশাপাশি সবজি চাষ করছেন।
সিংধা গ্রামের কৃষক সবুজ বলেন, ধান চাষের পাশাপাশি তার জমিতে লাউ, শিম, মূলা ও ডাটা শাক রোপন করে তার খরচের টাকা উঠে এখন লাভের মুখ দেখেছে।
গত বছর তিনি ধান চাষের পাশাপাশি বিভিন্ন জাতের শসা,লাউ,করলা এবং মার্টিনা জাতের লাউ বীজ রোপণ করেছেন।
এবার লাউ শাক বিক্রি করে বেশ টাকা এসেছে তার।
এ ব্যাপারে বারহাট্টা উপজেলা কৃষি অফিসার রাকিবুল হাসান বলেন, ফলন ভালো হওয়ায় কৃষক উচ্চফলনশীল ধান ও সবজি চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। উচ্চফলনশীল ধান চাষে অল্প খরচে দ্বিগুণ লাভ হওয়ায় কৃষকদের মাঝে ব্যপক সাড়া ফেলেছে। কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারে রীতিমতো বিপ্লব ঘটেছে। এখন চাষাবাদে কাঠের লাঙ্গলের ব্যবহার হয় না বললেই চলে। কৃষি কাজের মধ্যে সবচেয়ে শ্রমনির্ভর কাজ হচ্ছে বীজ বা চারা রোপণ, আগাছা দমন ও ফসল কাটা। মৌসুমের নির্দিষ্ট সময়ে বীজ বপন, চারা রোপণ এবং ফসল কেটে ঘরে তুলতে কৃষককে বেশ সঙ্কটে পড়তে হয়। ওই সময়ে কৃষি শ্রমিকের মজুরি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। কখনো কখনো দ্বিগুণ মজুরি দিয়েও কৃষি শ্রমিক পাওয়া যায় না। ফলে অনেক সময় বিলম্বে বীজ রোপণের জন্য ফলন কম হয়, পোকা-মাকড় ও রোগ-বালাইয়ের আক্রমণ বৃদ্ধি পায়। এসব থেকে রক্ষা পেতেই কৃষি কাজে আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করায় এতে যেমন সময় কম লাগছে, তেমনি বেশি ফসলও উৎপাদন হচ্ছে। যার ফলে কৃষক লাভবান হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন,আমরা কৃষি বিভাগ কৃষকের খুব কাছাকাছি থাকি এবং সবসময়ই থাকবো কৃষকের ভাগ্য উন্নয়নের জন‍্যে এটাই আমাদের কৃষি বিভাগের আঙ্গিকার।
ধান চাষ করে ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়েছেন বারহাট্টা’র কৃষকেরাও। এক সময় তারা ধানের উপর নির্ভনশীল থাকলেও এখন কৃষি বিভাগের পরামর্শে সবজি চাষ করছেন। অল্প সময়ে ফলন, খরচ কম এবং দাম ভালো পাওয়ায় কৃষকদের মাঝে আগ্রহ বাড়ছে সবজি চাষে। নেত্রকোনা জেলার বারহাট্টা’র সিংধা গ্রামের কৃষক সবুজ কয়েক বছর ধরে শিম,পেয়াজ,আলু,ভূট্টা আবাদ করে ভালো দাম পেয়েছেন। এবার এসবের পাশাপাশি অন্যান্য সবজিও চাষ করেছেন তারা।
অল্প সময়ে ফসল তোলার পাশাপাশি রোগবালাই এবং লোকসানের শঙ্কা কম বলে সবুজের মতো অনেকেই এখন ধানের পাশাপাশি সবজি চাষ করছেন।
জেলা কৃষি বিপণন কার্যালয়ের মতে, শস্য বিন্যাসের পাশাপাশি চাহিদা ও উৎপাদন কাছাকাছি থাকায় ভালো দাম পাচ্ছেন কৃষকরা। যার ফলে ফলন বাড়ার সাথে সাথে ভাগ্যে বদলাছে বারহাট্টা উপজেলার প্রতিটি গ্রামের কৃষকের।।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Releated