চবির চার প্রকল্পের নির্মাণকাজে ধীরগতি, দায় এড়াচ্ছে প্রশাসন

Share the post

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়: একের পর এক উপাচার্য বদল হলেও শেষ হচ্ছে না চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) তিনটি আবাসিক হল ও একটি অনুষদ ভবনের নির্মাণ কাজ। ফলে আসন সংকটে শিক্ষার্থীরা যেমন দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন তেমনি জরাজীর্ণ কলা ও মানববিদ্যা অনুষদে ক্লাস করতে বাধ্য হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।

২০১৬ সালের ২৪ অক্টোবর চবির দ্বিতীয় কলা ও মানববিদ্যা অনুষদ ভবন নিমাণের কার্যাদেশ পায় জিকেবিএল-দি বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ার্স (জেভি)। প্রায় ৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্পটির নির্মাণ কাজ ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে সমাপ্ত হওয়ার কথা থাকলেও এখনো হয়নি।

বর্তমানে চবির কলা ও মানববিদ্যা অনুষদে (ড. আব্দুল করিম ভবন) রয়েছে ১৮ টি বিভাগ ও ইনস্টিটিউট। বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছে স্বল্প সংখ্যক রুম। তাছাড়া অনুষদটি পুরাতন হয়ে যাওয়ায় বিভিন্ন কক্ষে দেখা দিয়েছে ফাটল। এতে তৈরি হয়েছে নিরাপত্তার ঝুঁকি। শ্যাওলার আবরণে নষ্ট হয়েছে সৌন্দর্য। আর অনুষদটির ওয়াশরুমগুলোর অবস্থা একেবারে নাজুক।

এছাড়া পর্যাপ্ত শ্রেণীকক্ষ না থাকায় অনেক বিভাগের শিক্ষার্থীদের ক্লাস করতে পড়তে হয় ভোগান্তিতে। এমন পরিস্থিতিতে অনুষদটির কাজ অতি শিঘ্রই সম্পন্ন করে খুলে দেওয়া আবশ্যক হয়ে গিয়েছে বলে মনে করছেন শিক্ষার্থীরা। তাড়াতাড়ি নতুন কলা ও মানববিদ্যা অনুষদ ভবন খুলে না দিলে অনুষদটির শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম হুমকির মুখে পড়বে বলেও সংশ্লিষ্টরা মত দিয়েছেন।

এদিকে ২০ শতাংশ শিক্ষার্থীর থাকার ব্যবস্থা করতে পারেনি পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তকমা পাওয়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বছরের পর বছর পার হয়েও শেষ হয়নি তিন হলের নির্মাণ কাজ। ২০১৫ সালের ৮ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার কন্যা শেখ হাসিনার নামে চবিতে দুটি হল বেশ আয়োজন করে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে একযোগে উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উদ্বোধনের চার বছরের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও শেখ হাসিনা হলে আসন বরাদ্দ না দেওয়ায় ছাত্রীরা দফায় দফায় বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করে। আন্দোলনের প্রেক্ষিতে পরে খুলে দেওয়া হয় হলটি। শেখ হাসিনা হলটি খুলে দেওয়া হলেও একই সময়ে শুরু হওয়া ছেলেদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের কাজ এখনও সমাপ্ত হয়নি।

তথ্যমতে, প্রথমে ১৮৬ আসন বিশিষ্ট প্রায় ৪৫ হাজার বর্গফুটের দোতলা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের উদ্বোধন করা হয়। ৯ কোটি ৭৫ লাখ ৮৫ হাজার টাকা ব্যয়ে এ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলটি নির্মাণও করা হয়। কিন্তু আসন বরাদ্দ না দিয়ে কাজ শেষ হওয়ার দেড় বছর পর ২০১৭ সালের মে থেকে হলটির ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের কাজ শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এর মধ্যে ১৮৬ আসন বিশিষ্ট দোতলা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলকে ৭৩৮ আসন বিশিষ্ট ছয়তলা ভবন করা হয়। ফলে এর মোট আয়তন দাঁড়ায় প্রায় ১৩ হাজার ৮৪৮ বর্গমিটার। যার নির্মাণ ব্যয় ৩৩ কোটি ১৪ লক্ষ ৪৭ হাজার টাকা। উদ্বোধনের চার বছরের বেশি সময় পেরিয়েছে, তবে এখনও অসম্পূর্ণ হলটি।

এদিকে ২০১৮ সালের ১৮ মে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল-এর ১ম পর্যায়ে সমাপ্তকৃত ভবনের উদ্বোধন করা হয়। ২২৫ আসন বিশিষ্ট ছাত্রীদের জন্য নির্মিত এ হলের ১ম পর্যায়ের নির্মাণ কাজের মোট ব্যয় হয় ১১ কোটি ২৮ লাখ টাকা।

তাছাড়া ২০১৬ সালের ২১ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু হলের পাশে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান হল নামে আরেকটি হলের। ২০১৮ সালের ৩০ মে এই হলটির প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ হলেও পুণরায় বর্ধিত করে এর কাজের পরিধি বাড়ানো হয়। অন্য প্রকল্পগুলোর মতো এটিও অসমাপ্ত এখনও।

সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন কলা ও মানববিদ্যা অনুষদের বৃহৎ ভবনটির প্রথম দিকে দুটি অংশের কাজ শেষ হয়েছে। শেষ অংশে চলছে এখনও কাজ। ইটের গাঁথুনির উপর দেওয়া হচ্ছে সিমেন্ট-বালির আস্তরণ। তাছাড়া ভেতরে বাকি আছে আরও বেশ কিছু কাজ। কিছু কিছু অংশে বৈদ্যুতিক সংযোগের কাজ করা হলেও বাকি রয়েছে আরও।

নতুন কলা ও মানববিদ্যা অনুষদের মতো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, আতীশ দীপংকর শ্রীজ্ঞান হল ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলেরও একই অবস্থা। তার মধ্যে অতীশ দীপংকর শ্রীজ্ঞান হলের প্রায় কাজ শেষ হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের রব হলের পেছনের সড়ক দিয়ে যেতে চকচকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল দেখা গেলেও এর পেছনের দিকে এখনও বাকি রয়ে গেছে অনেক কাজ। ইটের গাথুনিতে হলটির সব অংশ উপরের দিকে উঠলেও এখনও দেওয়া হয়নি প্রলেপ। আর পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগের কাজও রয়েছে অসম্পূর্ণ। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন হলগুলোর কাজ যেমন ধীর গতিতে চলছে তেমনি কলা ও মানববিদ্যা অনুষদের নির্মাণাধীন নতুন ভবনের প্রথম অংশে দেখা গেছে দেয়ালে ফাটল ধরার দৃশ্য। কাজ শেষ হওয়ার পূর্বে নির্মাণাধীন প্রকল্পে এমন দৃশ্য পরিলক্ষিত হওয়ায় প্রকল্পটির নির্মাণের গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা। এদিকে সঠিক পরিকল্পনা অনুসরণ না করে নির্মাণাধীন এই চারটি প্রকল্পেই লাগানো হয়েছে জানালার গ্লাস। আবার এর পাশেই চলছে অন্য ভবনের কাজ। আর উপর থেকে বালির আস্তরণ ও ইটের টুকরো পড়ে ভেঙ্গে পড়ছে জানালাগুলোর অধিকাংশ গ্লাস। ফলে পুণরায় লাগাতে হবে হল ও অনুষদ ভবনের জানালার গ্লাস। যার ফলে নষ্ট হবে অতিরিক্ত অর্থ। তবে সেই খরচের জিম্মাদার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী আবু সাঈদ।

রুটিন দায়িত্বপ্রাপ্ত থেকে সম্পূর্ণ দায়িত্বপ্রাপ্ত উপাচার্য হওয়া ড. শিরীণ আখতারের প্রায় ৭ মাস সময় কেটে গেছে। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর তেমন কোন অগ্রগতি দেখা যায়নি। বরং বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে গুঞ্জন উঠেছে ‘টেন্ডার-ভীতির’ কারণে উপাচার্য ড. শিরীণ আখতার নতুন প্রকল্পের কোন কাজ করছেন না। তাই তো ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনেই আটকে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন শহীদ মিনার, মসজিদ, সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্প ও জিরোপয়েন্ট থেকে ওয়াকওয়ের কাজ। নতুন শহীদ মিনার নির্মাণ না হওয়ায় গত ২১ ফেব্রুয়ারি উপাচার্যসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দপ্তর ‘বিতর্কিত’ শহীদ মিনারেই শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

এদিকে উপাচার্যের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে উঠে এসেছে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কাজের ধীরগতির কারণ। গত ৪ মার্চ কলা ও মানববিদ্যা অনুষদের নবীন বরণ অনুষ্ঠানে উপাচার্য ড. শিরীণ আখতার বলেন, ‘আমাকে বলা হয়েছে আপনি স্থাপনার দিকে যাবেন না, আপনি যাবেন যেভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্বমানের পড়াশোনা হয় সেদিকে’।

একজন উপাচার্য কি শুধুই বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাজে মনোযোগী হবেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা তার দায়িত্বের মধ্যে কেন পড়বে না তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তাছাড়া স্থাপনা ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে বিশ্বমানের শিক্ষায় এগিয়ে যাবে তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রবীণ শিক্ষক বলেন, স্থাপনা না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা থাকবে কোথায়? প্রতি বছর নতুন নতুন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে, চালু হচ্ছে নতুন বিভাগ। যদি স্থাপনা না হয় তাহলে শিক্ষার্থীরা ক্লাস কোথায় করবে? শিক্ষার আধুনিকায়ন কীভাবে হবে?

তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি অংশ। একটি একাডেমিক, আরেকটি প্রশাসনিক। একাডেমিক অংশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা নিয়ে কাজ করে। আর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে মানবসম্পদে রূপান্তরিত করাই মূল লক্ষ্য। কিন্তু এসবের জন্য তো স্থাপনার দরকার হবে। স্থাপনা ছাড়া কীভাবে শিক্ষার গুণগতমান বৃদ্ধি পাবে বা শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি হবে?

বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণাধীন প্রকল্পগুলোর ধীরগতির কারণ জানতে চাইলে চবি উপাচার্য ড. শিরীণ আখতার একুশে পত্রিকাকে বলেন, এটা তো আমার ব্যাপার না। এটা আগের কাজ। এসময় তিনি এ বিষযে জানতে কলা অনুষদের সাবেক ডিন ড. সেকান্দার চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলতে বলেন। এবং অনুষদটির কাজ সম্পূর্ণ করার জন্য অনেক চেষ্টা করছেন বলেও জানান তিনি।

গত ৪ মার্চ উপাচার্যের দেয়া বক্তব্যের সত্যতা নিশ্চিত করে তিনি বলেন, আমি তো এখনও স্থাপনার কাজে মনোযোগ দিই নাই। আগে একাডেমিক কাজগুলো শেষ করি পরে সেই দিকে মনোযোগ দেবো। একজন উপাচার্যের দায়িত্ব কি শুধু একাডেমিক দিক দেখা, নাকি স্থাপনার কাজও করা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাকে সময় পেতে হবে না? সময় পেলেই স্থাপনার কাজও করবো।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কলা ও মানববিদ্যা অনুষদসহ তিনটি হলের কাজ এখনও শেষ হচ্ছে না কেন সে বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী আবু সাঈদ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলোর হেয়ালিপনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কলা ও মানববিদ্যা অনুষদ এবং তিন হলের কাজ এখনও শেষ হচ্ছে না। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে দফায় দফায় বৈঠক করে কাজ সম্পূর্ণ করার তাগাদা দেওয়া হয়েছে।

কলা ও মানববিদ্যা অনুষদের কাজ শেষ না হওয়ার পেছনে আলোচিত-সমালোচিত যুবলীগ নেতা জিকে শামীমের গ্রেপ্তারের কোন প্রভাব আছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই প্রকল্পের যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে তাদের ব্যাংক হিসাব জিকে শামীমের সাথে যৌথ। সেজন্য বিভিন্ন সময় তারা বলেছে ব্যাংকে লেনদেন করতে তাদের সমস্যা পোহাতে হচ্ছে এবং সেজন্য তাদের লোক স্বল্পতা রয়েছে। তবে আমরা তাদের এই বছরের জুনের মধ্যেই কাজ শেষ করার তাগাদা দিচ্ছি।

প্রধান প্রকৌশলী আবু সাঈদ আরও বলেন, নতুন কলা ও মানববিদ্যা অনুষদে তিনটি বিভাগ স্থানান্তর করা যাবে বলে আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জানিয়েছি। তারা চাইলে নতুন ভবনে তিনটি বিভাগ নিয়ে আসতে পারেন।

এদিকে নির্মাণাধীন হলগুলোর কাজ কেন শেষ হচ্ছে না এমন প্রশ্নের জবাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই কর্মকর্তা বলেন, এই প্রকল্পগুলোর কাজও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সমস্যার কারণে শেষ হচ্ছে না। এসময় তিনি জুনের মধ্যে কাজ শেষ না হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে বিকল্প পদ্ধতি অনুসরণ করবেন বলেও জানান।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Releated