আদিবাসীদের বৈচিত্র্যময় জীবনধারা আকাশ-মাটির মিতালী

Share the post
সোহেল খান দূর্জয় নেত্রকোনা প্রতিনিধি : নেত্রকোনা জেলার সুসং দুর্গাপুর। আঁকাবাঁকা পথ, সবুজ পাহাড়, টিলা আর নদী-ছড়াবেষ্টিত এ প্রাচুর্যময় জনপদ। ভারত সীমান্তের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা নেত্রকোনার রত্নগর্ভা উপজেলা এটি। মেঘালয় রাজ্যের পাদদেশে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যমতি এ জনপদকে ঘিরে রয়েছে পর্যটন শিল্পের উজ্জ্বল সম্ভাবনা। কিন্তু উন্নত যোগযোগ ও সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে বিরাট এ সম্ভাবনাটি তেমন কাজে লাগছে না। উপরন্তু নানা প্রতিবন্ধকতায় গারো পাহাড়ের সৌন্দর্য অবলোকন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশ-বিদেশের ভ্রমণপিপাসুরা। সরকারও হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।
নেত্রকোনা শহর থেকে মাত্র দু’ঘণ্টার পথ পেরোলেই দুর্গাপুর। গারো, হাজং, কোচ, বানাই ও অন্যান্য আদিবাসী অধ্যুষিত পাহাড়ী জনপদ। একটু দূর থেকে দেখলে মনে হয়- এক খ- ঘন কালো মেঘ যেন সেই কবে থেকে আকাশ-মাটির সঙ্গে মিতালী করে আছে। বিরূপ প্রকৃতির সঙ্গে ক্ষুদ্র ও নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর বিরামহীন সংগ্রাম চলছে এখানে।
কথিত আছে, গহীন জঙ্গল আর জীব-জানোয়ারদের সঙ্গে মিতালী করে একসময় গারো আদিবাসীরা বসবাস শুরু করেছিল বলেই এর নাম হয় গারো পাহাড়। ‘সোমেশ্বর পাঠক’ নামে এক ধর্মযাজক প্রথম দুর্গাপুরে সুসং রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর বংশ পরম্পরায় রাজত্ব করেন আরও অনেকে। গারো বিদ্রোহ, হাজং বিদ্রোহ, টঙ্ক আন্দোলন, তেভাগা আন্দোলন ও হাতিখেদা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বহু বিপ্লব-বিদ্রোহের নীরব সাক্ষী হয়ে আছে এককালের এই সুসং পরগণা দূর্গাপুর।
দুর্গাপুরের সৌন্দর্য শুধু পাহাড়েই সীমাবদ্ধ নয়। ঘন সবুজ পাহাড়ের আড়ালে লুকিয়ে আছে সাদা, লাল ও বেগুনী রং-এর চিনামাটি (সাদামাটি) ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠী কালচারাল একাডেমি। বিজয়পুরের এ খনিজসম্পদ দেশের সিরামিক শিল্পে প্রধান কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিশাল এলাকাজুড়ে এই চিনামাটি আহরণের প্রক্রিয়াও মনোমুগ্ধকর, কাছে গেলে দর্শনার্থীরা চোখ এড়াতে পারেন না। এছাড়া পাহাড় থেকে নেমে আসা সোমেশ্বরী নদীও এক বিচিত্র ঝর্ণাধারা। পাহাড়-নদীর অপরূপ মেলাবন্ধন সেখানে। বর্ষায় এ নদী রাক্ষুসী রূপ নেয়। ভাসিয়ে দেয় বিস্তীর্ণ জনপদ-ফসল। শুকনো মৌসুমে নদীর বুকজুড়ে থাকে কয়লা ও বিশাল বালিরাশি। সিলিকা নামের এই বালিও নির্মাণ শিল্পে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া সোমেশ্বরীর দিগন্তজোড়া বালিরাশি দেখেও মনে হয় এ যেন সমুদ্র সৈকত।
ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতির নানা উপাদান ছড়িয়ে আছে দুর্গাপুরে। সুসং রাজবাড়ি, কমরেড মণি সিংহের বাড়ি, টঙ্ক আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত টঙ্ক স্মৃতিসৌধ, বহেরাতলি গ্রামের রাশিমণি স্মৃতিসৌধ, কমলা রানীর দীঘি, চিনামাটির পাহাড়, অমূল্য সম্পদ রাশি রাশি বালু ও কয়লা, কালচারাল একাডেমি, রানীখং মিশনসহ অনেক ঐতিহাসিক নিদর্শনের সমাহার এই জনপদ। এখানকার ক্ষুদ্র ও নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর রয়েছে নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি যা পরিচয় করিয়ে দেয় ব্যতিক্রম জীবনধারার সঙ্গে। তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও চর্চার কেন্দ্র হিসেবে দুর্গাপুরের বিরিশিরিতে রয়েছে সুদৃশ্য কালচারাল একাডেমি। এ ছাড়াও আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে রয়েছে- কারুকার্যমতি ধর্মীয় মন্দির, গীর্জা ও উপাসনালয়। বিজয়পুর সীমান্তে গড়ে উঠেছে ভারত-বাংলাদেশের যৌথ স্থল শুল্ক বন্দর। ভারতের কিছু এলাকারও দেখা মিলবে দুর্গাপুর ওই সীমান্তে দাঁড়ালে।
দুর্গাপুরের নৈসর্গিক সৌন্দর্য সারাবছরই দর্শনার্থীদের হৃদয় কাড়ে। তবে পিকনিকের স্পট হিসেবে শীত মৌসুমে সেখানে ভ্রমণবিলাসীদের ভিড় উপচে পড়ে। শীত এলেই পাহাড় কন্যা দুর্গাপুর খুঁজে পায় পুরনো অতিথিদের সঙ্গে নতুন নতুন মুখ। অনেক বিখ্যাত পর্যটকরাও উপভোগ করে গেছেন দুর্গাপুরের সৌন্দর্য। দৃশ্যবন্দী করেছেন দেশ-বিদেশের চিত্র নির্মাতারা। একটু কাছে গেলেই এর প্রকৃতি হাতছানি দিয়ে ডাকে আগন্তুকদের। ভাবিয়ে তোলে ভ্রমণবিলাসী, প্রকৃতিপ্রেমিক, কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পীদের। কিন্তু বলাবাহুল্য, উন্নত যোগাযোগ আর সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে দুর্গাপুর এখনও এক উপেক্ষিত জনপদ।
বৈচিত্র্যময় আদিবাসী সংস্কৃতিচর্চার বিরিশিরি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমি অন‍্যতম।বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নৃ-গোষ্ঠীর নান্দনিক ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি জাতীয় সংস্কৃতিতে যোগ করেছে এক অনন্য মাত্রা। নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মূল্যবান ও আকর্ষণীয় সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য দুর্গাপুর উপজেলার আদিবাসী এলাকা মেঘালয় কন্যা সোমেশ্বরী নদীর পাদদেশে, বিরিশিরিতে ১৯৭৭ সালে গড়ে ওঠে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমি। এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে আদিবাসীদের মধ্যে ঐতিহ্য-সচেতনতা সৃষ্টি এবং নিজস্ব সংস্কৃতির গুরুত্ব উপলব্ধিতে জাতিগত বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পারিক সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও সু-ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করা। বাংলাদেশের অন্যতম সংখ্যালঘু আদিবাসী গারো, হাজং, কোচ, বানাই ও ডালু সম্প্রদায় বৃহত্তর টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর গড় অঞ্চল, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া, নেত্রকোনার দুর্গাপুর, কলমাকান্দা, শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী, নালিতাবাড়ীসহ সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলার সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে বসবাস করেন। তারা শত প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। সময়ের আবর্তে তাদের সাংস্কৃতিক জগতে কিছুটা পরিবর্তন ঘটলেও এখনো সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় রয়ে গেছে। সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসবে, অতিথি আপ্যায়নের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে পিছিয়ে নেই আদিবাসী জনগোষ্ঠী। তাদের সমাজে এখনো যে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিলক্ষিত হয় তা বেশ সমৃদ্ধ ও মনোমুগ্ধকর। প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকেই এগুলো ধরে রেখেছে নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুরের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমি। প্রতি বছরই অনুষ্ঠিত হয় বার্ষিক আদিবাসী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ওয়ানগালা ও আদিবাসী সমাবেশ, যেখানে মিলনমেলায় পরিণত হয় বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা আদিবাসী জনগোষ্ঠীদের।
গারো-হাজংদের কৃষ্টি সংস্কৃতি ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়াসে প্রথম এগিয়ে আসেন দুর্গাপুরের আদিবাসী এলাকা বিরিশিরির এক উচ্চশিক্ষিত নারী প্রয়াত বিভা সাংমা। তার জীবনের শেষ সময়টুকুও বিলিয়ে দিয়েছেন এ কালচারাল একাডেমির জন্য। পরে বিশিষ্ট কবি রফিক আজাদ ১৯৯৬ সালে অত্র একাডেমিতে পরিচালক হিসাবে যোগদান করে বাংলা গান, বাউল, পালাগান, বিচার পালাসহ কবি গানের মতো উপজাতীয় কিছু রেঁ রেঁ গানের স্তবক উদ্ধার করেন। বর্তমান প্রতিষ্ঠানটিতে পরিচালক হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন কবি ও গীতিকার সুজন হাজং। তিনি যোগদানের পর থেকে গারো, হাজং, কোচ, বানাই ও ডালু সম্প্রদায়ের হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতি নিয়ে কাজ শুরু করেন। আদিবাসী শিল্পীদের গহনাগাঁটি, অত্যাধুনিক বাদ্যযন্ত্র, ব্যবহৃত অস্ত্র, বস্ত্র-পরিচ্ছদসহ কুটিরশিল্পের প্রচুর আসবাবপত্র সংগ্রহ করে সমৃদ্ধ করেন আদিবাসী জাদুঘর। পাশাপাশি গবেষণা ও সাংস্কৃতিক শাখাকে উন্নত করে বাংলা সংস্কৃতিতে এনেছেন নান্দনিকতা। আদিবাসীদের নৃত্য কলা, সংগীত, অভিনয়সহ আদিবাসীদের নৃত্যগীত ও অভিনয়ের জন্য শিল্পীদের প্রশিক্ষণ, মিউজিকের ওপর প্রশিক্ষণ, বাংলা সাধারণ ও লোকনৃত্যসহ নজরুল ও রবীন্দ্র সংগীত এবং আধুনিক গানের ওপর প্রশিক্ষণ দিয়ে আদিবাসী সংস্কৃতি তথা বাংলা সংস্কৃতিকে আধুনিকতার ছোঁয়ায় জাগিয়ে তোলার প্রয়াসে কাজ করছেন তিনি। তিনি জানিয়েছেন, একাডেমির গবেষণা শাখাকে আরও সমৃদ্ধ করতে আদিবাসীদের ওপর লিখিত পুস্তকসহ সাধারণ জ্ঞানের ওপর প্রায় ৫ হাজার মূল্যবান পুস্তক সংগ্রহ করা হয়েছে। সুসজ্জিত করা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর কর্নার। বর্তমান পরিচালক সুজন হাজং একজন সংস্কৃতিসেবী হওয়ায় আগের তুলনায় এখন প্রতিটি সাংস্কৃতিক পর্বই পালন করা হয়ে থাকে। একই সঙ্গে আধুনিকতার ছোঁয়া পেয়েছে একাডেমির রেস্ট হাউজ, অডিটরিয়াম, আদিবাসী শিল্পীদের পোশাকসহ আশপাশের খালি জায়গাতে রোপণকৃত ফুল বাগান।
একাডেমির বর্তমান কার্যক্রম প্রসঙ্গে একাডেমির পরিচালক গীতিকার সুজন হাজং বলেন, ‘প্রতিটি জাতিরই রয়েছে নিজ নিজ সংস্কৃতি। আর এ সংস্কৃতির মাঝেই খুঁজে পাওয়া যায় তাদের ঐতিহ্য। আমি একাডেমিতে যোগদানের পর থেকে এ এলাকার আদিবাসী সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা, আমাকে একাডেমির পরিচালকের দায়িত্ব দেওয়ার জন্য। আমি আমার দায়িত্ববোধ থেকে অত্র অঞ্চলে বসবাসকারী সব আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি উদ্ধারে এলাকার প্রবীণ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সহায়তা নিয়ে কাজ করছি। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নয়নসহ তাদের সংস্কৃতি রক্ষা ও বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাকে আধুনিকায়ন করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সব সময় কাজ করে যাচ্ছেন। এসব কাজে সহায়তা করার জন্য সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি।
তিনি আরও জানান, যারা প্রাকৃতিক নিবিড় সান্নিধ্যে কিছু সময় কাটাতে চান, দেখতে চান আদিবাসীদের নৃত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বাংলাদেশে অল্প পরিচিত অথচ দর্শনীয় ব্যতিক্রমী স্থান, তাদের নেত্রকোনার সুসং দুর্গাপুরের বিরিশিরি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমিতে বেড়িয়ে আসতে পারেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Releated