অর্ধেক নিছক প্রেমের, বাকিটা…

Share the post

সিনেমা নিয়ে আলাপ শুরুর আগে বলাকা নিয়ে একটু না বললেই না। ‘কাঠবিড়ালী’র আগে বলাকায় ‘দেখা’ ছবির নাম ‘আবার বসন্ত’। অনন্য মামুন পরিচালিত সেই ছবিতেও তারিক আনাম খানের সঙ্গে পর্দা ভাগ করেছিলেন ‘কাঠবিড়ালী’ অভিনয়শিল্পী অর্চিতা স্পর্শিয়া। ‘আবার বসন্ত’ অর্ধেকটা শেষ হতে না হতেই কাঁপতে শুরু করল বড় পর্দা। ঝিরঝির করে। কিছুই দেখা যায় না। প্রায় ৩০ মিনিট অপেক্ষার পরও ঠিক করা গেল না। ক্ষুব্ধ দর্শকদের চাপের মুখে বলাকা কর্তৃপক্ষ টিকিটের পুরো টাকা ফেরত দিয়ে বাড়ি পাঠাল।

বলাকার উঠোনের উন্নয়ন ঘটলেও আজ পর্যন্ত প্রজেকশন সিস্টেমের তেমন কোনো স্থায়ী কার্যকর ব্যবস্থা তারা নিয়েছে বলে মনে হয় না। ‘ডলবি ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেম’-এর অবস্থাও বিশেষ সুবিধার না। সে জন্য অনম বিশ্বাস পরিচালিত ‘দেবী’ সিনেমাটি বলাকায় দেখেই আবার সিনেপ্লেক্সে দেখতে হয়েছে। কারণ, সেই ছবিতে সাউন্ড খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ‘কাঠবিড়ালী’ সিনেমাটিও ভালো দেখা যায়নি, ভালো শোনাও যায়নি। রাজধানীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই হলের আশু সংস্কার জরুরি। কারণ, হল না থাকলে ছবি দেখব কোথায়? পর্দায় এল ‘কাঠবিড়ালী’
‘কাঠবিড়ালী’ নামটা এখানে একটা মেটাফোর। এই প্রাণীকে আপনি আপনার আশপাশেই দেখেন। সে পেয়ারা, গুড়মুড়ি খাক বা না খান, তাকে আপনি একটু উঁকি দিয়েই নারকেলগাছের আড়ালে উধাও হয়ে যেতে দেখেন। ধরতে পারেন না। এই ছবির চরিত্রগুলোর সঙ্গে ‘কাঠবিড়ালী’র সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ মিল আছে। যেন মনে হয়, আপনি তাঁকে বুঝতে পারছেন। কিন্তু ঠিক ধরতে পারছেন না। মুখ্য তিন চরিত্রে অভিনয় করেছেন অর্চিতা স্পর্শিয়া, আসাদুজ্জামান আবীর, সাইদ জামান শাওন ও শাহরিয়ার ফেরদৌস সজীব। ছবিতে স্পর্শিয়ার নাম থাকে কাজল। সে বাদে বাকি তিনজন মূলত তার প্রেমিক। প্রথম অর্ধেক নিছক প্রেমের ছবি, বাকিটা ক্রাইম থ্রিলার
সিনেমা যখন অর্ধেক, ততক্ষণে তিনটা প্রেমের গান, নায়কের সঙ্গে নায়িকার প্রেম, বিয়ে—সব হয়ে গেছে। ভিলেনকে তার বাবা সৌদি আরব পাঠিয়ে দিয়েছে। যখনই সিনেমা ‘অবশেষে তারা সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে লাগিল’—এমন একটা জায়গায় পৌঁছেছে, তখনই গল্পের মোড় ঘোরানো ঘটনা ঘটল। প্রথম অর্ধেক দেখে মনে হবে, এ তো আদ্যিকালের মরচে ধরা পুরোনো গল্প, নতুন কী? ‘নতুন কী’—এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে বিরতির পরের অংশে। সেখানে কোনো গান নেই, গ্রামের সুন্দর দৃশ্য কম। অবশ্য প্রজেকশনের যে হাল, সুন্দর গ্রাম আর দেখা গেল কই! দ্বিতীয় অংশে ‘কাঠবিড়ালী’ আটকেছে দর্শকদের। ‘সিআইডি’, ‘তালাশ’ বা ‘ক্রাইম পেট্রল’ দেখে যাঁদের চোখ, মন অভ্যস্ত, তাঁরা উপভোগ করবেন। এই বেলা ক্রাইম থ্রিলারের অলিখিত একটা সূত্র বলে রাখি। যার ওপর সন্দেহের তির সবচেয়ে কম তাক করা থাকে, সে-ই কিন্তু ক্রিমিনাল! ভালো নম্বর পাবে মিউজিক
এই ছবিতে তিনটি গান রয়েছে। প্রতিটি গান আর গানের দৃশ্যায়নের আলাদা করে প্রশংসা করতেই হবে। সেখানে স্লো মোশন, ড্রোনের ব্যবহার, ক্যামেরার কারুকাজ চোখে প্রশান্তি দেয়। ‘তোমারে দেখিব আমি’ গানটি ষোড়শ শতাব্দীর ‘চন্দ্রাবতী পালা’ থেকে নেওয়া। চন্দ্রাবতী বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম বাঙালি নারী কবি। এই ছবির সংগীতায়োজনের জন্য ইমন চৌধুরী প্রশংসার দাবিদার। ইউসুফ হাসান অর্কের সুরে গানগুলোয় কণ্ঠ দিয়েছেন ইমন চৌধুরী, শফি মণ্ডল, কনা ও ফকির সাহেব। তাঁদেরও এই চমৎকার সংগীতায়োজনের কৃতিত্ব দিতে হবে। গানগুলো এককথায় মিউজিক প্লেয়ারে ‘রিপিটেড মুডে’ বাজার মতো।

কেমন হলো গল্প?
গল্পের প্রথম অর্ধেকটা যথেষ্ট ধীর। সেখানে এমন সব সংলাপ আছে, যেগুলো আপত্তিজনক, কিছু দর্শককে ‘যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ সুড়সুড়ি’ দিয়ে বিনোদিত করে। গ্রামের চেয়ারম্যান খারাপ, অপদার্থ চেয়ারম্যানপুত্র, পুরুষের কাজ বাজার করা, নারীর কাজ রান্না করা আর প্রেমিকের ‘সামর্থ্য না বুঝে’ তার কাছে সোনার আংটি উপহার আশা করা, দুর্নীতিবাজ পুলিশ চরিত্র—পর্দায় এসব দেখে দেখে দর্শক ক্লান্ত। তবে নারীর প্রথাবিরোধী ভূমিকায়ও স্বল্প সময়ের জন্য হলেও দেখা দিয়েছেন স্পর্শিয়া। সিনেমায় দেখায়, কাজলরূপী স্পর্শিয়া স্কুলে পড়ে আর হাসুর সঙ্গে প্রেম করে। হঠাৎ বিয়ে করে সংসারও শুরু করে দেয়। তাই মনে প্রশ্ন জাগে, এটা বাল্যবিবাহ নয় তো? বিয়ের পর আর তাকে স্কুলে যেতে দেখা যায়নি।

ছবিতে ‘দ্য সৌদি ফ্যাক্ট’ বলে একটা ব্যাপার আছে। সৌদি যাওয়ার আগের আর পরের চেয়ারম্যানপুত্র একেবারে ১৮০ ডিগ্রি ভিন্ন মানুষ। তবে দ্বিতীয় ভাগে দর্শকের চোখ, মন পর্দার আটকে ফেলার ব্যবস্থা করেছেন পরিচালক। সিনেমা শেষে কাজল, হাসু আর হাসুর বন্ধুর চরিত্রের গ্রাফ যেভাবে শেষ হয়, সেটা এই গল্পের শক্তশালী দিক। প্রথম আলোকে এই পরিচালক জানিয়েছেন, হাসু তাঁর গ্রামের চেনা চরিত্র। বাস্তবের হাসুর অনুপ্রেরণায় তিনি পর্দার হাসুকে বিনির্মাণ করেছেন।

অভিনয়ের নয়ছয় ও কিছু ধন্যবাদ
চরিত্রগুলোর জন্য অভিনয়শিল্পী বাছাই ভালো বলতে হয়। স্পর্শিয়া যে প্রায় দুই বছর ধরে পাঁচ ধাপে শুটিং দলের সঙ্গে কাজ করার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন, অভিনয়ের প্রতি তাঁর এই প্রতিশ্রুতি খুবই ইতিবাচক। যদিও গ্রামের মেয়ের চরিত্রে তাঁর শহুরে শরীর, চুল, হৃদয় কিঞ্চিৎ বেমানান। গ্রামীণ টোনে সংলাপগুলোও তাঁর মুখে ‘আরোপিত’ লাগে। তা ছাড়া সবার অভিনয় সহজ-স্বাভাবিক ছিল। একটা গ্রামের এত বৈচিত্র্যময় লোকেশন দেখানোর জন্য পরিচালকের একটা ধন্যবাদ প্রাপ্য। আরও বড় ধন্যবাদ দিতে হয় নিজের একরকম একক প্রচেষ্টায়, জমানো সমস্ত অর্থ এই ছবিতে লগ্নি করে, কোনো স্বল্পদৈর্ঘ্যের অভিজ্ঞতা ছাড়াই এ রকম একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বানিয়ে ফেলার সাহস করার জন্য। সিনেমার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা থাকলেই এটা সম্ভব। ধন্যবাদ প্রাপ্য চিত্রগ্রাহক আর পোশাক ও শিল্প নির্দেশকেরও।

সব মিলিয়ে কোনো কিছু মাথায় না নিয়ে নিছক বিনোদনের উদ্দেশ্যে সিনেমাটি হলে গিয়ে দর্শকের দেখা উচিত।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Releated